তারাতলা গুদাম বিপর্যয়: মৃত বেড়ে ৫, নকশায় ত্রুটির অভিযোগে ৩১ জুলাই পর্যন্ত কলকাতার সমস্ত নির্মাণকাজে স্থগিতাদেশ মুখ্যমন্ত্রীর

তারাতলা গুদাম বিপর্যয়: মৃত বেড়ে ৫, নকশায় ত্রুটির অভিযোগে ৩১ জুলাই পর্যন্ত কলকাতার সমস্ত নির্মাণকাজে স্থগিতাদেশ মুখ্যমন্ত্রীর

তারাতলায় একটি নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ধসে পড়ে ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনও পর্যন্ত পাঁচ জন শ্রমিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও ২০ জন শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে অন্তত দু’জনের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ঘটনাস্থলে এখনও বেশ কিছু মানুষের আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী।

কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?

বুধবার বেলা ১২টা ৭ মিনিটে তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের ওই নির্মীয়মাণ গুদামটিতে আচমকাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে ছাদ। লোহার বিশাল কাঠামো ও কংক্রিটের স্তূপের নীচে মুহূর্তে চাপা পড়ে যান প্রায় ৪০ জন শ্রমিক। প্রত্যক্ষদর্শী উজ্জ্বল কুমারের কথায়, “হঠাৎ ভূমিকম্পের মতো প্রবল ঝাঁকুনি ও বিস্ফোরণের মতো বিকট আওয়াজ শুনতে পাই। ছুটে গিয়ে দেখি পুরো গুদামটাই ভেঙে পড়েছে।” স্থানীয় সূত্রের খবর, গুদাম তৈরির জন্য লোহার কাঠামোর উপর কংক্রিটের স্তর চাপানো হয়েছিল। সকাল থেকেই কাঠামোটি নড়ছিল এবং তা পরখ করতে যাওয়ার সময়ই আচমকা ছাদটি ধসে পড়ে। গুদামের ভেতরেই শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা থাকায় মহিলারাও এই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

যৌথ উদ্ধারকাজ ও পুলিশি তদন্ত

দুর্ঘটনার খবর পেয়েই প্রথমে পুলিশ, দমকল এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী উদ্ধারকাজে নামে। পরে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে রাজ্য সরকারের অনুরোধে ভারতীয় সেনা এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীও (NDRF) অভিযানে যোগ দেয়। একাধিক হাইড্রোলিক ক্রেন এনে ভারী লোহার বিম সরানোর কাজ শুরু হয়। গ্যাস কাটার দিয়ে লোহা কেটে ফাঁকা অংশ তৈরি করে আটকে থাকা শ্রমিকদের বের করার চেষ্টা চলে। উদ্ধার হওয়া লোহার বিমের গায়ে লেগে থাকতে দেখা গিয়েছে রক্ত ও মাংসপিণ্ড।

এই ঘটনায় পুলিশ ইতিমধ্যেই একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। গুদামের সুপারভাইজার-সহ তিন জনকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

কাঠামোগত ত্রুটির অভিযোগ: পুরসভার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, প্রাথমিক ভাবে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলে গুদামের নকশায় (ডিজাইন) বড়সড় ত্রুটির কথা জানা গিয়েছে। বৃষ্টির কারণে মাটি বসে এই দুর্ঘটনা ঘটেনি দাবি করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,

“আমি ইঞ্জিনিয়ার নই, তবে ঘটনাস্থল দেখে মনে হয়েছে বৃষ্টিতে মাটি বসে এই বিপর্যয় হয়নি। তাহলে লোহার বিম এভাবে বেঁকে যেত না। লোহার কাঠামোর নাট খুলে স্লিপ করে বেরিয়ে গিয়েছে।”

ইমারত বিশেষজ্ঞ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই নির্মাণ নকশাকে ‘ভয়ঙ্কর রকম ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত ১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভা এই গুদামের নকশায় অনুমোদন দিয়েছিল এবং কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষও এতে আপত্তি করেনি। ফলে ত্রুটিপূর্ণ নকশায় কীভাবে পুরসভা সবুজসঙ্কেত দিল, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে।

৩১ জুলাই পর্যন্ত কলকাতায় সমস্ত নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ

তারাতলা বিপর্যয়ের পর কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি ঘোষণা করেছেন:

  • নির্মাণে স্থগিতাদেশ: কলকাতা পুরসভা এলাকায় সমস্ত ধরনের নির্মাণকাজ আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি পরিষেবাকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
  • বিশেষ অডিট: তৃণমূল জমানায় অনুমোদিত সমস্ত নির্মাণ ও বহুতলের নকশা খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল গঠন করা হচ্ছে। এই দলে থাকবেন রাজ্যের পূর্ত, অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতর, দমকল, কলকাতা পুলিশ এবং কলকাতা পুরসভার আধিকারিকেরা।
  • নতুন নিয়ম: বিশেষ দলটির রিপোর্টের ভিত্তিতে যাঁরা নিয়ম মেনে কাজ করছেন, তাঁরা আগামী ১ আগস্ট থেকে পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু করতে পারবেন। বিশেষত বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত এবং জলাশয় বুজিয়ে তৈরি হওয়া নির্মাণগুলির ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হবে।

হতাহতদের পরিবার কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ পাবে এবং সরকার কী কী আইনি পদক্ষেপ করবে, তা বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বিধানসভায় স্পষ্ট করবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

বন্দর কর্তৃপক্ষের জমি ও ঠিকাদারের ভূমিকা

কলকাতা পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনাস্থলের জমিটি আদতে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে তাঁরা ‘বেহরা ব্রাদার্স’ নামক একটি সংস্থাকে ৩০ বছরের জন্য জমিটি লিজ দেয়। চা-পাতা গুদামজাত এবং প্যাকেজিংয়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এই সংস্থার মালিক শম্ভুনাথ বেহরা। জমি লিজ নিয়ে তিনিই এই নির্মাণকাজ করাচ্ছিলেন।

এই ঘটনায় কাঠগড়ায় উঠে এসেছে আসগর নামের এক ঠিকাদারের নাম। স্থানীয়দের দাবি, আসগর স্থানীয় কাউন্সিলর আনোয়ার খানের ঘনিষ্ঠ। সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম অভিযোগ করেছেন, এই নির্মাণে যে কোনও নিয়ম মানা হচ্ছে না, তা জানিয়ে গত ১১ জুন সিটুর (CITU) বন্দর কর্মী ইউনিয়নের তরফে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষকে একটি দু’পাতার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। শ্রমিক সুরক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাজ করার বিষয়ে প্রশাসনকে আগে জানানো সত্ত্বেও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে সরব হয়েছে বাম নেতৃত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.