ভারতীয় নাগরিকদের জন্য এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিল দেশের শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট বার্তা— রাস্তায় চিহ্নিত ফুটপাত দিয়ে নিরাপদে হেঁটে যাওয়ার অধিকার ভারতীয় সংবিধানের অধীনে একটি ‘মৌলিক অধিকার’ (Fundamental Right)। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যুর মামলার রায় দেওয়ার সময় শীর্ষ আদালত পর্যবেক্ষণ করে যে, রাস্তায় যানচলাচলের চেয়েও পথচারীদের ফুটপাত ব্যবহারের অধিকার সবসময় অগ্রাধিকার পাবে।
সংবিধানের ১৯(১)(ডি) অনুচ্ছেদের অধীনে সংরক্ষিত অধিকার
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি এ এস চান্দুরকরের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেয়। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানায়, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার অধিকার সংবিধানের ১৯(১)(ডি) [Article 19(1)(d)] অনুচ্ছেদের অধীনে সংরক্ষিত, যা ভারতের সমগ্র ভূখণ্ডে নাগরিকদের অবাধে চলাচলের অধিকার দেয়।
বেঞ্চ তার পর্যবেক্ষণে বলে:
‘‘যদি কোনও রাস্তা থাকে, তা হলে সেখানে পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট বা চিহ্নিত ফুটপাত অবশ্যই থাকতে হবে। যানবাহন ব্যবহারের অনেক আগে থেকেই এই অধিকারের অস্তিত্ব রয়েছে এবং সংবিধান একে সর্বদা প্রাধান্য দেয়।’’
মামলার পটভূমি ও হাই কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই মামলার উৎস একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এক পিতা তাঁর পাঁচ বছর বয়সী নাবালক সন্তানকে সকালে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় পিছন থেকে একটি ট্যাঙ্কার লরি শিশুটিকে সজোরে ধাক্কা মারে। দুর্ঘটনায় শিশুটির কোমর এবং শরীরের নীচের অংশ গুরুতর জখম হয়। পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়।
তদন্তে জানা যায়, দুর্ঘটনাস্থলে পথচারীদের হাঁটার জন্য কোনও ফুটপাত বা রাস্তা পারাপারের (জেব্রা ক্রসিং) ব্যবস্থা ছিল না। এই ঘটনার পর ক্ষতিপূরণের দাবিতে মামলাটি হাই কোর্ট ঘুরে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায়।
দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা ও ক্ষতিপূরণ বৃদ্ধির নির্দেশ
দেশের নগরোন্নয়ন ব্যবস্থার খামতি তুলে ধরে শীর্ষ আদালত আক্ষেপ প্রকাশ করে জানায়, নিরাপদ ও আরামদায়ক ফুটপাতের অভাব ভারতে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। বিশেষ করে শহরাঞ্চলগুলিতে পথচারীদের হাঁটার অধিকারকে উপেক্ষা করে প্রায়শই কেবল যানচলাচলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, এই ধরণের চিহ্নিত ফুটপাতে হাঁটার অধিকার লঙ্ঘিত হলে নাগরিকেরা ১৯৯৮ সালের মোটর ভেহিকল আইনের অধীনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অবশ্যই ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকারের দাবি জানাতে পারেন।
এই মামলার রায় দিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পূর্ববর্তী ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মৃত শিশুর পরিবারকে ১১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৬২৮ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আগামী দু’মাসের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে দুই বিচারপতির বেঞ্চ।

