টলিউড স্টুডিওপাড়ার নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গঠনকে কেন্দ্র করে চরম নাটকীয়তা তৈরি হলো রাজ্য রাজনীতি তথা বিনোদন মহলে। টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী এবং শিবপুরের বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষের সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মন্তব্যে তীব্র বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে টলিউডে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং বিভ্রান্তি দূর করতে অবশেষে আসরে নামতে হয়েছে রাজ্য প্রশাসনকে।
পাপিয়া অধিকারীর ঘোষণা ও টলিউডে বিভ্রান্তি
গত বুধবার ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স কনফেডারেশন’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেত্রী তথা বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী এক চাঞ্চল্যকর বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, টলিউড স্টুডিয়োপাড়ায় দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সংগঠন ‘ফেডারেশন’ বা ‘গিল্ড’-এর আর কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। এবার থেকে সমগ্র টলিউড নিয়ন্ত্রিত হবে দিল্লি থেকে এবং সমস্ত কলাকুশলী এই সর্বভারতীয় কনফেডারেশনের আওতাভুক্ত হবেন। এমনকি শুক্রবার থেকেই ন্যূনতম মূল্যে এর সদস্যপদ পাওয়ার ফর্ম বিলি করা হবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
পাপিয়া অধিকারীর এই ঘোষণার পর থেকেই স্টুডিওপাড়ার কলাকুশলীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। ‘মেকআপ আর্টিস্ট গিল্ড’-এর সদস্য পাপিয়া চন্দ সংবাদমাধ্যমকে বলেন:
“আমরা অবশ্যই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসকে আর পদে চাই না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা আমাদের মূল ‘ফেডারেশন’ সংগঠনটিকেই বিলুপ্ত করতে চাই! এমন কথা তো আমরা বলিনি।”
নন্দনে রুদ্রনীলের পাল্টা বার্তা ও মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ
পাপিয়া অধিকারীর এই একতরফা দাবির পর বৃহস্পতিবার নন্দন চত্বরে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেন শিবপুরের বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ। বাংলা বিনোদন দুনিয়ার সমস্ত কলাকুশলীকে আশ্বস্ত করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, দল বা সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
রুদ্রনীল ঘোষ বলেন,
“টলিউডের সংগঠন বন্ধ বা দিল্লি থেকে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার মতো কোনও নির্দেশ সম্মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দেননি। এমনকি রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর থেকেও এই ধরণের কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। যা কিছু হবে, তা সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ম মেনে হবে। হয় মুখ্যমন্ত্রী নিজে, নয়তো তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের পক্ষ থেকে নির্দেশিকা জারি করা হবে। সকলের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।”
রণক্ষেত্র টালিগঞ্জ: প্রতিবাদ এবং ‘বহিরাগত’ হামলা
পাপিয়া অধিকারীর বার্তার জেরে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে টলিউডে। বিশেষ করে তিনি যখন ‘ডি কিউব’ তত্ত্বের কথা উল্লেখ করে মহম্মদ হাসান, নিরুপম দে, বাপি মালাকার, স্বপন মজুমদার এবং সুজিত হাজরার মতো একাধিক পদাধিকারীকে ‘অভিযুক্ত’ তকমা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা করেন, তখন অসন্তোষ আরও বাড়ে।
এরই প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকালে টালিগঞ্জের ভরাট মাঠ এলাকায় বিভিন্ন গিল্ডের সদস্যরা একটি প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন। কিন্তু সেই সমাবেশ চলাকালীন আচমকাই আন্দোলনকারীদের ওপর ইট ও ডিম বৃষ্টি শুরু হয়, যার জেরে এলাকাটি কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিক্ষুব্ধ কলাকুশলীদের অভিযোগ, কিছু ‘বহিরাগত’ এসে তাঁদের ওপর চড়াও হয়ে মারধর করেছে। আক্রমণকারীরা নিজেদের বিধায়ক ‘পাপিয়া দির লোক’ বলে পরিচয় দিয়েছিল। অবশ্য পরবর্তীতে এক সাংবাদিক বৈঠক ডেকে এই সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন পাপিয়া অধিকারী।
সচিবের দ্বারস্থ কলাকুশলীরা: নিরুপমের পাল্টা চ্যালেঞ্জ
টালিগঞ্জের এই নজিরবিহীন অশান্তির পর প্রোডাকশন ম্যানেজার গিল্ডের অভিযুক্ত সহ-সম্পাদক নিরুপম দে এবং মহম্মদ হাসানসহ সমস্ত গিল্ডের প্রতিনিধিরা সরাসরি নন্দনে যান। সেখানে তাঁরা রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই বৈঠকেই উপস্থিত হন রুদ্রনীল ঘোষও। প্রতিনিধি দলে রূপসজ্জাশিল্পী সোমনাথ কুন্ডু, পাপিয়া চন্দ এবং কেশবিন্যাসশিল্পী হেমা মুন্সী সহ টলিউডের প্রথম সারির টেকনিশিয়ানরা উপস্থিত ছিলেন।
| প্রতিনিধি দলের পদক্ষেপ | অভিযুক্তের বক্তব্য ও চ্যালেঞ্জ |
| পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও সমাধানের লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে জরুরি বৈঠকের আবেদন জানিয়ে সচিবের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেয় কলাকুশলীদের এই দলটি। | প্রশাসনের তরফে তাঁদের আবেদনপত্রটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং তা দ্রুত মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। |
| নন্দনে দাঁড়িয়ে বিরোধী পক্ষের উদ্দেশ্যে পাল্টা ওপেন চ্যালেঞ্জ ছোড়েন অভিযুক্ত নিরুপম দে। | “আমাদের বিরুদ্ধে কাটমানি, আর্থিক তছরুপ কিংবা নারীঘটিত কেলেঙ্কারির যে সমস্ত গুরুতর অভিযোগ আনা হচ্ছে, তার একটিও যদি প্রমাণিত হয়, তবে আমি নিজে গিল্ডের সদস্যপদ ত্যাগ করে চিরতরে ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে চলে যাব।” |
রাজনৈতিক পালাবদলের পর টলিউডের প্রশাসনিক ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে একদিকে পাপিয়া অধিকারীর দিল্লির সমীকরণ এবং অন্যদিকে রুদ্রনীল ঘোষের নবান্ন-কেন্দ্রিক সরকারি অবস্থানের এই সংঘাত আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা টলিপাড়া।

