মহিলাদের জন্য আর্থিক অনুদান প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নিয়ে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা সামনে এল। দীর্ঘ দিন ধরে নারীদের জন্য বরাদ্দ এই সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের আর্থিক সুবিধা ভোগ করছিলেন একজন পুরুষ। বুধবার স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তথ্য-প্রমাণসহ সাংবাদিক বৈঠক করে এই দুর্নীতির খতিয়ান ফাঁস করার পরেই রাজ্য রাজনীতি ও জেলা প্রশাসনের অন্দরে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে।
ভুয়ো উপভোক্তার তালিকায় নাম থাকা ওই ব্যক্তির নাম রাকিবুল শেখ। তিনি মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের রাধারঘাট-১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য এবং পেশায় একজন হোটেল ব্যবসায়ী।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া অবস্থান
বুধবার একটি উচ্চপর্যায়ের সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানান যে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে দেদার বেনোজল ঢুকেছে এবং ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এই কারণেই প্রকৃত ও যোগ্য মানুষদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে এখন থেকে প্রত্যেককেই নতুন ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’-এর ফর্ম পূরণ করতে হবে।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে মুখ্যমন্ত্রী জালিয়াতিতে অভিযুক্ত পঞ্চায়েত সদস্য রাকিবুল শেখের নাম, ঠিকানা ও পারিবারিক সমস্ত তথ্য প্রকাশ করেন। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে নিয়মিতভাবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাসিক ভাতা পাচ্ছিলেন পুরুষ সদস্য রাকিবুল। শুধু তাই নয়, তাঁর স্ত্রীও সমান্তরালভাবে এই প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করছিলেন। উল্লেখ্য, এই দম্পতি এসআইআর (SIR)-এর ‘বিচারাধীন’ তালিকায় থাকায় এবারের নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেননি।
“বিগত সরকার দুর্নীতির ছিল, তাই সুবিধা নিয়েছি”: দাবি অভিযুক্তের
এই বড়সড় জালিয়াতি প্রকাশ্যে আসতেই মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসনের অন্দরে শোরগোল পড়ে গেছে। তবে সরকারি ভাতার টাকা নিজের পকেটে পুরলেও নিজের কোনো ‘ভুল’ বা অপরাধ দেখছেন না অভিযুক্ত তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য রাকিবুল শেখ। উল্টে তিনি সম্পূর্ণ দায় চাপিয়েছেন রাজ্যের বিদায়ী তৃণমূল সরকারের ওপর।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিতর্কিত বয়ানে রাকিবুল বলেন:
“বিগত সরকার দুর্নীতির সরকার ছিল, তাই আমরা সুবিধা নিয়েছি। আমার অ্যাকাউন্টে কীভাবে টাকা ঢুকছিল, তা আমি প্রথমে জানতাম না। টাকা ঢোকার পর বিডিও (BDO) অফিসে গেলেও কেউ পাত্তা দেয়নি। বন্ধুরা বলেছিল, টাকা যখন ঢুকছে, ঢুকুক— অসুবিধা তো নেই! আমার নাম হয়তো এখানে জড়িয়ে গিয়েছে, কিন্তু সঠিক যাচাই করলে দেখা যাবে ওই বিদায়ী সরকারের আমলে প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতি করেছে।”
দায় এড়াতে পঞ্চায়েত ও ব্লক প্রশাসনের কাদা ছোড়াছুড়ি
মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্পে একজন পুরুষের নাম কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো, তা নিয়ে এখন পঞ্চায়েত ও ব্লক প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে।
রাধারঘাট-১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মেনুকা বেগম পঞ্চায়েতের ওপর থেকে সমস্ত দায় ঝেড়ে ফেলে জানিয়েছেন, “এসব বিষয় আমরা গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে দেখি না। বিডিও অফিস থেকেই সব তালিকা ঠিক হয়েছে। আমাদের কাছে এই সংক্রান্ত কোনো ডেটা বা নথি নেই। বিগত সরকারের ‘দুয়ারে সরকার’ ক্যাম্প থেকেই সরাসরি এই আবেদনগুলি করা হয়েছিল এবং সেখান থেকেই অনুমোদন পেয়েছে।”
মহিলাদের জন্য তৈরি একটি সংবেদনশীল সরকারি প্রকল্পে পুরুষের নাম ঢুকে যাওয়া এবং টাকা তোলার পরেও প্রশাসনের এই চরম উদাসীনতা ও গাফিলতির জেরে মুর্শিদাবাদসহ গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ এই মুহূর্তে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

