স্কুলের চরম অমানবিকতা ও গাফিলতির কারণে আট বছরের এক ছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়াল। মৃত ছাত্রের নাম আয়ুষকুমার নাথ (৮)। সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত। এই বেদনাদায়ক ঘটনার প্রতিবাদে এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের শাস্তির দাবিতে মঙ্গলবার সকাল থেকেই স্কুলের সামনে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ দেখান ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে।
প্রথম পিরিয়ড থেকে অসুস্থ, কাটল ৬টি পিরিয়ড
অভিভাবকদের সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ মে প্রথম ক্লাস থেকেই স্কুলের ভেতরে তীব্র গরমে অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে বছর আটেকের আয়ুষ। সে তার শ্রেণিশিক্ষিকাকে শারীরিক অসুস্থতার কথা জানালেও, শিক্ষিকা বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে তাকে স্রেফ বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসে থাকার নির্দেশ দেন।
আশ্চর্যজনকভাবে, দীর্ঘ সময় ওভাবে কেটে যাওয়ার পর ক্লাসেরই এক সহপাঠী শিক্ষিকাকে অনুরোধ করে যাতে আয়ুষের বাড়িতে খবর দেওয়া হয়। কিন্তু সহপাঠীদের মনে যে কথা এসেছিল, শিক্ষিকার মধ্যে সেই তৎপরতা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ। ফলস্বরূপ, চিকিৎসার বা বাড়িতে খবর দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা না করে টানা ৬টি পিরিয়ড অসুস্থ আয়ুষকে ওই গরমের মধ্যে ক্লাসঘরে বসিয়ে রাখা হয়।
ছুটির পর সিঁড়ি থেকে পড়ে মাথায় আঘাত
স্কুল ছুটির পর পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে আয়ুষ। সহপাঠীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তীব্র গরমে মাথা ঘুরে যাওয়ার কারণে এক আয়া-মাসিকে ব্যাগের ভার কমানোর কথা বলা হলেও কেউ তার ব্যাগটি চেয়ে নেননি। ফলস্বরূপ, পিঠের ভারী ব্যাগের কারণে সিঁড়ি থেকে নিচে পড়ে যায় শিশুটি এবং তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে।
বাড়ি ফেরার পর আয়ুষের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিন দিন চিকিৎসার জন্য রাখা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় কলকাতার এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অচৈতন্য অবস্থায় থাকার পর গত রবিবার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আট বছরের এই শিশুটি।
“অতিরিক্ত ফি, অথচ ক্লাসঘরে মাত্র দুটি পাখা!” ক্ষোভ অভিভাবকদের
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর স্কুলের পরিকাঠামো এবং অতিরিক্ত ফি আদায় নিয়ে সরব হয়েছেন অন্য পড়ুয়াদের অভিভাবকেরা। সোমবার অভিভাবকদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রথম এই মৃত্যুর খবরটি জানাজানি হয়। মঙ্গলবার এক বিক্ষোভকারী অভিভাবক ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন:
“ভর্তির সময়ে ৩৩ হাজার টাকারও বেশি ফি নেওয়া হয়েছিল। বই-খাতা ও ব্যাগের খরচ তো আলাদা রয়েছেই। প্রতি বছর নতুন করে ভর্তি হতে আরও ২০ হাজার টাকার বেশি দিতে হয়। অথচ প্রতিটি ক্লাসে ৪০-৪২ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য মাত্র দুটি করে পাখা লাগানো রয়েছে! এমনকি স্কুলের শৌচালয়ের অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। এত টাকা নেওয়ার পরও শিশুদের ন্যূনতম সুরক্ষার দিকে তাকানোর সময় হয় না কর্তৃপক্ষের।”
পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিয়ে এখন চরম দুশ্চিন্তা ও মানসিক অশান্তিতে ভুগছেন অন্য অভিভাবকেরা। শরীর খারাপ হওয়ার পরেও কেন স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাত্রের বাড়িতে একটা ফোন পর্যন্ত করলেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। স্কুল কর্তৃপক্ষের এই আচরণকে ‘অমানবিক’ এবং পুরো পরিচালন ব্যবস্থাকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তাঁরা।
ভেঙে দেওয়া হবে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি: বিধায়ক
মঙ্গলবার সকালে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এবং ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের আশ্বস্ত করতে স্কুল প্রাঙ্গণে আসেন স্থানীয় বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী। তিনি অভিভাবকদের সাথে কথা বলেন এবং আশ্বাস দিয়ে জানান যে, এই চরম গাফিলতির দায়ে স্কুলের বর্তমান ম্যানেজিং কমিটি (Managing Committee) ভেঙে দেওয়া হবে।
প্রশাসন এই বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী আইনি পদক্ষেপ করবে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছেন সকলে। তবে ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের একটাই বক্তব্য— প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেবে তা জানা নেই, কিন্তু স্কুলের অমার্জনীয় গাফিলতিতে যে মায়ের কোল খালি হয়ে গেল, সেই ক্ষতিপূরণ আর কোনো মূল্যেই সম্ভব নয়।

