ভোটদানে সর্বকালীন জাতীয় রেকর্ড গড়ল পশ্চিমবঙ্গ: ৯২ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনন্য নজির

ভোটদানে সর্বকালীন জাতীয় রেকর্ড গড়ল পশ্চিমবঙ্গ: ৯২ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনন্য নজির

রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ। সদ্য সমাপ্ত দুই দফার বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের হারে সমস্ত পুরনো রেকর্ড ভেঙে দিয়ে সর্বভারতীয় স্তরে নতুন উচ্চতায় পৌঁছল বাংলা। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে গড় ভোটদানের হার ৯২ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে আজ পর্যন্ত যেকোনো বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে সর্বোচ্চ।


পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধা: ভোটার কমলেও বাড়ল ভোট

কমিশনের দেওয়া তথ্য এক চাঞ্চল্যকর সত্য সামনে এনেছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় এবার পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৫১ লক্ষ কম ছিল। তা সত্ত্বেও, ভোটদাতার সংখ্যা গতবারের তুলনায় ৩০ লক্ষেরও বেশি বেড়েছে।

  • চূড়ান্ত হার: দ্বিতীয় দফা শেষে রাত ১২টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ভোট পড়েছে ৯২.৬৩ শতাংশ
  • সামগ্রিক গড়: দুই দফা মিলিয়ে রাজ্যে মোট ভোটদানের হার দাঁড়িয়েছে ৯২.৯৩ শতাংশ

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে বাম শাসনের অবসানের সময় রাজ্যে ৮৪.৩৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল, যা এতদিন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ছিল। ১৩ বছর পর সেই রেকর্ড এবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।


কেন এই বিপুল ভোটদান?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে এমন এক বড় অংশ বুথমুখী হয়েছেন, যাঁরা সাধারণত ভোটদান থেকে বিরত থাকেন। এছাড়া আগে যাঁরা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে ভোট দিতে পারতেন না, তাঁরাও এবার নির্ভয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন।

  • বিধানসভা ভিত্তিক বৃদ্ধি: দুই দফার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে প্রায় ১০ হাজার বেশি ভোট পড়েছে।
  • প্রথম দফার প্রভাব: প্রথম দফার আসনগুলিতে কেন্দ্র প্রতি গড়ে ১৪,২৩৭ জন বেশি ভোট দিয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় এই বৃদ্ধির পরিমাণ ৬,৬১৫।

অতিরিক্ত ৩০ লক্ষ ভোট: কার দিকে পাল্লা ভারি?

এই বিপুল সংখ্যক ‘অতিরিক্ত’ ভোটারই এবার নির্বাচনের ভাগ্যবিধাতা হতে চলেছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। চিরাচরিত ধারণা অনুযায়ী, ভোটের হার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেলে তা সাধারণত ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে বা ‘পরিবর্তনের’ পক্ষে যায়।

  • বিরোধী যুক্তি: বিরোধীরা ২০১১ সালের উদাহরণ টেনে দাবি করছেন, সেবার বিপুল ভোটদানের ফলেই ৩৪ বছরের বাম দুর্গের পতন হয়েছিল।
  • শাসক শিবিরের পাল্টা যুক্তি: তৃণমূল নেতৃত্ব এই তত্ত্ব মানতে নারাজ। তাঁরা গত বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে জানাচ্ছেন, সেবারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং জনতা শাসকের পক্ষেই রায় দিয়েছিল। এছাড়া প্রতিবেশী বিহারেও ভোট বাড়ার পর ক্ষমতাসীন সরকার ফিরে আসার নজির রয়েছে।

বুথফেরত সমীক্ষা ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সংস্থার বুথফেরত সমীক্ষা (Exit Poll) সামনে এসেছে। অধিকাংশ সমীক্ষায় বিজেপিকে কিছুটা এগিয়ে রাখা হলেও, তৃণমূলের সঙ্গে তাদের লড়াই যে অত্যন্ত ‘কাঁটায় কাঁটায়’, সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কোনো কোনো সমীক্ষা আবার তৃণমূলের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না।

তবে ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে বুথফেরত সমীক্ষা অনেক সময় ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাই ৯২.৯৩ শতাংশের এই বিশাল ম্যান্ডেট শেষ পর্যন্ত কার ঝোলায় যায়, তার উত্তর মিলবে আজকের চূড়ান্ত ফলাফলেই। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, গোটা দেশ এখন তাকিয়ে বাংলার এই রেকর্ডভাঙা জনাদেশের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.