মালদহের মোথাবাড়িতে বিচারকদের ঘেরাও ও বিক্ষোভের ঘটনায় রাজ্য পুলিশের ওপর আস্থা না রেখে সরাসরি এনআইএ (NIA) তদন্তের নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার এই মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, স্থানীয় পুলিশের পক্ষে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়। একইসঙ্গে, আদালতের ফোন না ধরা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ে রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালাকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছে শীর্ষ আদালত।
তদন্তভার এনআইএ-র হাতে
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে গত সপ্তাহে মালদহের মোথাবাড়ি ও সুজাপুর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সাত জন বিচারককে রাত পর্যন্ত ব্লক অফিসের ভেতরে আটকে রাখে উত্তেজিত জনতা। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে:
- ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে এনআইএ-কেই তদন্তভার গ্রহণ করতে হবে।
- রাজ্য পুলিশ এ পর্যন্ত যে ১২টি এফআইআর দায়ের করেছে, তার সবকটিই এনআইএ-র অধীনে আসবে।
- তদন্তের স্বার্থে এনআইএ নতুন এফআইআর দায়ের করতে পারবে এবং ধৃত ২৪ জনকেও এনআইএ-র হাতে তুলে দিতে হবে।
- তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত স্ট্যাটাস রিপোর্ট চার্জশিট পেশের আগে সুপ্রিম কোর্টে জমা দিতে হবে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, “সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আমরা এই নির্দেশ দিচ্ছি। স্থানীয় পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকায় তারা এই তদন্ত করতে পারবে না।”
মুখ্যসচিবকে নজিরবিহীন ভর্ৎসনা
শুনানি চলাকালীন রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালার ভূমিকা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত। ঘটনার দিন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল মুখ্যসচিবকে ফোন করলেও তিনি ধরেননি বলে অভিযোগ ওঠে।
আদালত কক্ষের উল্লেখযোগ্য মন্তব্য:
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী: “আপনার নিরাপত্তা কি এতটাই বেশি যে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিও যোগাযোগ করতে পারেন না? অনুগ্রহ করে নিজেকে একটু নীচে নামিয়ে আনুন, যাতে সাধারণ মানুষও আপনার নাগাল পায়। আমাদের কাছে নয়, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে গিয়ে ক্ষমা চান।”
মুখ্যসচিবের দাবি ছিল, তিনি সেদিন দিল্লিতে বৈঠকে ছিলেন এবং বিমান সফরে থাকায় ফোন পাননি। কিন্তু আদালত এই যুক্তি গ্রহণ না করে প্রশাসনিক ‘যোগাযোগের ঘাটতি’কেই রাজ্যে অশান্তির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রশাসনের ব্যর্থতা ও কমিশনের ভূমিকা
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জেলাশাসক (DM) এবং পুলিশ সুপার (SP) ঘটনাস্থলে সময়মতো পৌঁছোননি, যা চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরিচয়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানান, প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণেই নির্বাচন কমিশন যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আমলাতন্ত্রের এই অনড় মনোভাব কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, অন্যান্য রাজ্যেও সমস্যার সৃষ্টি করছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বর্তমানে মালদহকাণ্ডে মোট ৪৩২ জন তদন্তকারীদের নজরে রয়েছেন এবং সন্দেহভাজনের তালিকায় রয়েছেন ৩০৯ জন। এনআইএ-র এই তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার নেপথ্যে থাকা বৃহত্তর কোনো ষড়যন্ত্র বা অন্য কারও উস্কানি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

