মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা-ইরান-ইসরায়েল সংঘাত যখন ২৩ দিনে পা দিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই সমুদ্রের রণকৌশলে নিজেদের দাপট জানান দিল চিন। সম্প্রতি চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) তাদের সবথেকে শক্তিশালী এবং বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ ‘টাইপ ০৫৫ ডেস্ট্রয়ার’ থেকে সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। চিনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি বিরল ভিডিওতে দেখা গেছে, এই রণতরী থেকে ছোড়া পাঁচটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইলই নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
ডেস্ট্রয়ার না কি ক্রুজার? দ্বন্দ্বে বিশেষজ্ঞরা
যদিও চিন এটিকে ‘ডেস্ট্রয়ার’ হিসেবে অভিহিত করছে, তবে অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞের মতে এটি আসলে একটি ‘ক্রুজার শ্রেণির’ যুদ্ধজাহাজ। আমেরিকার বিশালকার ক্রুজারগুলোর সমতুল্য এই রণতরীটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সারফেস কমব্যাট ভেসেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২০ সালে এই সিরিজের প্রথম জাহাজ ‘নানচ্যাং’ (হাল ১০১) চিনা নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছিল।
টাইপ ০৫৫-এর বিধ্বংসী ক্ষমতা
চিনা নৌবাহিনীর এই ‘গেমচেঞ্জার’ রণতরীটি কেন আলোচনার কেন্দ্রে, তার কিছু মূল কারণ নিচে দেওয়া হলো:
- বিশাল আকার ও গতি: প্রায় ১৮০ মিটার দীর্ঘ এই জাহাজের ওজন ১২ থেকে ১৩ হাজার টন। গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিনের সাহায্যে এটি ঘণ্টায় প্রায় ৫৫ কিমি গতিতে ছুটতে পারে।
- ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার: এতে রয়েছে বিশাল ‘ভার্টিকাল লঞ্চ সিস্টেম’ (VLS), যা একসঙ্গে ১১২ থেকে ১২৮টি মিসাইল বহন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল, ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল এবং হাইপারসনিক মিসাইল।
- উন্নত রাডার ও স্টেলথ প্রযুক্তি: এই জাহাজে রয়েছে আধুনিক AESA রাডার সিস্টেম, যা একসঙ্গে বহু লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে সক্ষম। এছাড়া স্টেলথ প্রযুক্তির কারণে এটি শত্রুর রাডারে সহজে ধরা পড়ে না।
- আকাশ ও জলপথের সুরক্ষা: জাহাজটিতে হেলিকপ্টার ডেক ও হ্যাঙ্গার রয়েছে, যা সাবমেরিন বিরোধী অভিযানে বড় ভূমিকা পালন করে।
রণতরী বনাম ডেস্ট্রয়ার: পার্থক্য কী?
সাধারণভাবে সমুদ্রের যুদ্ধের জন্য তৈরি সব জাহাজই ‘রণতরী’। ডেস্ট্রয়ার হলো সেই রণতরীর একটি নির্দিষ্ট ধরণ যা মূলত নৌবহরকে সুরক্ষা দিতে এবং শত্রু জাহাজ বা সাবমেরিন ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়। চিনের কাছে বর্তমানে এই টাইপ ০৫৫ শ্রেণির ১০টি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে: “টাইপ ০৫৫-এর অন্তর্ভুক্তি চিনা নৌবাহিনীকে এক লাফে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। এটি সরাসরি আমেরিকার শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ারগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।”
আমেরিকার সঙ্গে টক্কর
বর্তমানে আমেরিকার ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ ক্লাস রণতরীকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে চিনের এই নতুন পরীক্ষা এবং টাইপ ০৫৫-এর আধুনিক প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে সমুদ্রযুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রযুক্তি, গতি এবং আগ্রাসী ক্ষমতার সমন্বয়ে এই ডেস্ট্রয়ার এখন চিনের অন্যতম প্রধান সামরিক অস্ত্র।

