নারীর শারীরিক ও মানসিক অধিকারই শেষ কথা: ৩০ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা তরুণীকে গর্ভপাতের অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট

নারীর শারীরিক ও মানসিক অধিকারই শেষ কথা: ৩০ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা তরুণীকে গর্ভপাতের অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট

সমাজ বা সম্পর্কের ঊর্ধ্বে একজন নারীর নিজের শরীরের ওপর অধিকারই যে চূড়ান্ত, তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ১৮ বছর বয়সী এক অবিবাহিত তরুণীর গর্ভপাতের আবেদন মঞ্জুর করে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, কোনো নারী যদি সন্তান জন্ম দিতে না চান, তবে আদালত বা সমাজ তাঁকে বাধ্য করতে পারে না।

হাইকোর্টের রায় খারিজ শীর্ষ আদালতে

অবাঞ্ছিত সম্পর্কের জেরে অন্তঃসত্ত্বা হওয়া ওই তরুণী গর্ভপাতের আবেদন নিয়ে প্রথমে বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তবে গর্ভস্থ ভ্রূণের পূর্ণতা পাওয়ার যুক্তিতে হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপরই মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায়। শুক্রবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ হাইকোর্টের সেই রায় বাতিল করে দেয় এবং ৩০ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ওই তরুণীর শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে গর্ভপাতের অনুমতি দেয়।

যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ: মাতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া যায় না

আদালত এই মামলায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। বিচারকদের মতে:

  • সন্তানধারণ করলেই যে তাকে প্রসব করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
  • মাতৃত্বের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা একজন নারীর আছে।
  • সমাজ বা প্রচলিত ধারণার চেয়ে ওই নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও মানসিক স্বাস্থ্যকেই আইনি গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞ মহলের প্রতিক্রিয়া

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে ‘অত্যন্ত প্রগতিশীল’ বলে মনে করছেন নারী ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা। ডায়ামন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপিকা অপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “যে সন্তান অবাঞ্ছিত, তাকে অনাদরের দুনিয়ায় আনার কোনো অর্থ হয় না। এতে মা এবং সন্তান দুজনেই সমস্যার সম্মুখীন হন।”

সমাজতত্ত্বের অধ্যাপিকা বাসবী চক্রবর্তী এই রায়কে নারীমুক্তি আন্দোলনের একটি বড় জয় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “বহু উন্নত দেশও নারীর এই স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয় না। উন্নত বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে যখন ‘প্রো-লাইফ’ আন্দোলনের চাপে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, সেখানে ভারতের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সদর্থক।”

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ভারতের আইন

বিশ্বের বহু দেশে গর্ভপাতকে ‘ভ্রূণহত্যা’ বা অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি রাজ্যে ৬ সপ্তাহের পর গর্ভপাত নিষিদ্ধ। ইউরোপের মাল্টা বা পোল্যান্ডের মতো দেশেও এই নিয়ে কড়া বিধি-নিষেধ রয়েছে। ভারতে সাধারণত ২০ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাতের জন্য অনুমতির প্রয়োজন হয় না। ২০ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভপাত করতে হলে মেডিকেল বোর্ডের সম্মতির দরকার পড়ে। ২৪ সপ্তাহ পার হলে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩০ সপ্তাহের মাথায় গর্ভপাত করানো শারীরিক ও মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, যদি চিকিৎসকরা সবুজ সঙ্কেত দেন, তবে একজন নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্তই আইনিভাবে শিরোধার্য হওয়া উচিত। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় সেই আধুনিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই স্বীকৃতি দিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.