টানা প্রায় ১২ ঘণ্টা তুমুল বিতর্কের পর লোকসভায় পাস হয়ে গেল ওয়াকফ বিল। বুধবার মধ্য়রাতেরও পরে ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ২৮৮টি। বিপক্ষে পড়ে ২৩২ ভোট। আজ ওয়াকফ বিল পেশ হবে রাজ্যসভায়। ওই বিল নিয়ে বিরোধীদের কোনও যুক্তিই শেষপর্যন্ত মানতে চায়নি সরকার। সৌগত রায় প্রশ্ন তোলেন জেপিসিতে দেওয়া বিরোধীদের মতামতকে কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি গতকালই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্য বলেন, ওয়াকফ বিল মুসলিমদের স্বার্থ বিরোধী। কিন্তু বিরোধীদের কোনও কথাতেই কান দিল না সরকার। সংখ্য়ার বলে পাস হয়ে গেল ওয়াকফ বিল।
দেশে রেল ও সেনাবাহিনীর পরই সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি রয়েছে ওয়াকফের হাতে। নতুন ওয়াকফ আইনে সেই সম্পত্তির উপরে সরকার এবার সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবে বলে মনে করছে মুসলিম মহল। পাশপাশি, বিরোধীর বক্তব্য ছিল ওয়াকফ বিল সরাসরি মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার উপরে হস্তক্ষেপ।
অন্যদিকে, গতকালই সরকারপক্ষের একাধিক ব্যক্তি দাবি করতে থাকেন ওয়াকফ বিল সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়। এর সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। ওয়াকফ হিসেবে বহু মানুষ বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি নিয়ে বসে রয়েছে কংগ্রেসের তোষণ নীতির ফলে। এই সম্পত্তি নিয়ে বিপুল পরিমাণ দুর্নীতি রয়েছে। সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদে মুসলিম মহিলারা বঞ্চিত, অনাথরা বঞ্চিত।
গতকাল তাঁর বক্তব্যে অমিত শাহ বলেন, দেশে বহু সম্পত্তি এমন রয়েছে যা ওয়াকফ অথচ তা মন্দিরের সম্পত্তি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দিল্লির লুটিয়েন্স জোনের বহু সম্পত্তি ওয়াকফ হয়ে গিয়েছিল। সরকারি জমিও নিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। তামিলনাড়ুতে ৪০০ বছরের পুরনো মন্দিরের সম্পত্তিও ওয়াকফ হয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন ধর্মের সম্পত্তি ওয়াকফ হিসেবে ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল। প্রয়াগরাজে চন্দ্র শেখর পার্কও ওয়াকফ সম্পত্তি। আপনি অন্য কারও সম্পত্তি ওয়াকফ হিসেব দান করতে পারেন না। পারেন একমাত্র নিজের সম্পত্তি দিতে। এই বিল যদি না আনা হত তাহলে এই সংসদ ভাবনও ওয়াকফ সম্পত্তি হয়ে যেত।
কংগ্রেসকে নিশানা করে অমিত শাহ বলেন, ২০১৩ সালের ওয়াকফ আইন কংগ্রেস যদি সংশোধন করত তাহলে এই আইন বিজেপিকে সংশোধন করতে হত না। ২০১৩ সালে ওয়াকফ আইন করা হয় মুসলিমদের তোষণ করার জন্য। এর ফলে দিল্লির ১২৩টি সম্পত্তি ওয়াকফের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ভোটের মাত্র ২৫ দিন আগে ওই কাজ করে কংগ্রেস।
ওয়াকফ কী
মুসলিমরা তাদের সম্পত্তির কিছুটা অংশ ধর্মীয় কাজকর্মে ও মুসলিম সম্প্রদায়ের উন্নতির জন্য দান করে থাকেন। খুব সহজ করে বললে এটাই হল ওয়াকফ। এই সম্পত্তির আয় থেকে মসজিদের খরচ চালানো হতে পারে, শিক্ষার কাজে ব্যবহার হতে পারে, অনাথদের সাহায্য করা হতে পারে। ওইসব সম্পত্তি পরিচালনা করার জন্যে রয়েছে ওয়াকফ বোর্ড। ওয়াকফ দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হল যে সম্পত্তির দেখাভাল ও তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন জনসাধারণ। অন্যটি হল, কোনও সম্পত্তি ওয়াকফ করে দেওয়া হল তবে তার দেখাভাল করবেন সম্পত্তি দানকারীই। এনিয়ে পুরনো আইন রয়েছে। তা এবার সংশোধন করতে চলেছে কেন্দ্র। গোটা দেশে মোট ৮.৭ লাখ ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। ভারতীয় রেল ও সেনাবাহিনীর পরই দেশে ওয়াকফের বেশি সম্পত্তি রয়েছে।
সরকার কী করতে চাইছে
ওয়াকফের সংজ্ঞা বদল করা।
ওয়াকফ সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন করার পদ্ধতির বদল।
ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণে টেকনোলজির ব্যবহার বাড়ানো।
সরকার চাইছে ট্রাস্ট আর ওয়াকফের একটা পার্থক্য করতে। মুসলিমরা যে কোনও আইনেই কোনও সম্পত্তি ট্রাস্ট করুক না কেন তা আর ওয়াকফ বলে গন্য হবে না।
নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্ম পালনকারী মুসলিমরাই একমাত্র তাদের সম্পত্তি ওয়াকফ করতে পারবেন।
কোনও সম্পত্তি ওয়াকফ করার আগে সেই সম্পত্তির কোনও মহিলা ওয়ারিশ যদি থাকেন তাহলে তাদের প্রাপ্য মিটিয়ে দিতে হবে। বিধবা, অনাথ ও বিবাহ বিচ্ছিন্ন মহিলাদের স্বার্থ দেখতে হবে।
কোনও সরকারি সম্পত্তি যদি কেউ ওয়াকফ বলে দাবি করেন তাহলে তার তদন্ত করতে পারবেন কালেক্টরের উপরের ব়্যাঙ্কের কোনও অফিসার।
ওয়াকফ সম্পত্তির আয় যদি ১ লাখ টাকার উপরে হয় তাহলে সেই আয়ের অডিট করাতে হবে। ওই অডিট করবেন রাজ্যের অডিটররা।
ওয়াকফ সম্পত্তির বর্ণনা থাকবে একটি সেন্ট্রালাইজড পোর্টালে।
যারা মোতোয়াল্লি বা দেখভাল করেন তাদের ওয়াকফ সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে।
কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের ওয়ারফ বোর্ডে ২ জন অমুসলিম প্রতিনিধি থাকবেন।
টানা আইনি জটিলতা এড়াতে ওয়াকফ সম্পত্তিতে ১৯৬৩ সালের লিমিটেশন আইন বলবত হবে।
যে কোনও সম্পত্তিতে ওয়াকফ বলে ঘোষণা করা যাবে না।