দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরে ঠাকুরের মধ্যলীলাস্থল। তারই খুব কাছে সাবর্ণ চৌধুরী বংশধারার এক সন্তান যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীদের গৃহ। যোগীন তাই মাঝেমাঝেই উদ্যানে বেড়াতে আসেন। মন্দিরের সঙ্গে সেই পরিবারের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। ‘পাগলা বামুন’ বলে ঠাকুরের নামও শুনেছেন তিনি, কিন্তু তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানেন না, আলাপও হয় না। পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন লিখিত প্রবন্ধ পড়ে তাঁকে জানতে এবং দর্শন করতে আগ্রহী হলেন তিনি। কিন্তু আপনার স্বভাব-সুলভ লজ্জায় নিজে থেকে আলাপ করে যেতেও পারলেন না। একদিন উদ্যানে হাঁটছেন তিনি। দেখলেন এক অতীব সুন্দর ফুল প্রস্ফুটিত হয়ে আছে। ফুলটি পাবার আগ্রহ জন্মালো তাঁর, দেবতার পুজোয় দেবেন। দক্ষিণেশ্বরের উদ্যানের ফুলে যেন তাদের পারিবারিক অধিকার! তাঁর বাবাও চাঁদনির ঘাটে গঙ্গাস্নান করতে আসেন এবং বাগান থেকে পুজোর ফুল তুলে তবে বাড়ি যান। যোগীন সেদিন নিজ হাতে ফুল না তুলে অতি সাধারণ পোষাকের একজনকে মালি ভেবে তাকেই ডাক দিয়ে আদেশ করলেন ফুলটি তুলে দিতে হবে। লোকটি বিনা বাক্য ব্যয়ে তা চয়ন করে যোগীনের হাতে তুলে দিলেন। পরে আরেক দিন দেখলেন, মন্দির চত্বরে এক গৃহ মধ্যে মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন তিনি, আর গভীর মনোযোগ সহকারে বহু মানুষ তাঁকে ঘিরে তত্ত্বকথা শুনছেন। এই মালিই তো তাঁকে ফুল দিয়েছিলেন! তাঁর মধ্যে দ্বন্দ্ব। ঈশ্বরকে তিনি ফুল দেবেন, তা না, তাকেই ঈশ্বর ফুল দিলেন! ‘লীলাপ্রসঙ্গে’ পাচ্ছি, শ্রীরামকৃষ্ণের অনুভবে জগদম্বার কৃপায় ঈশ্বরকোটির যে ছয়জন ব্যক্তিকে ঠাকুর পূর্বেই জানতে পেরেছিলেন, যোগীন তার অন্যতম। দুই অনন্য অসাধারণ মহাপুরুষের সাক্ষাৎ হল সেদিন। যোগীন বাক্-রহিত, কাঠের পুতুলের মতো বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠাকুরই ভেতরে ডেকে পাঠালেন তাঁকে। যোগীনকে স্নেহভরে সামনে বসালেন, “তুমি আমাদের চেনা ঘর গো! …. তোমার লক্ষণ বেশ সব আছে। বেশ আধার — খুব (ভগবদ্ভক্তি) হবে।” যোগীন ধরা পড়ে গেলেন। নির্জনতাপ্রিয় যোগীন সকলের সামনে আসেন না। সকলের অলক্ষ্যে আসেন, ঠাকুরের ভক্তরা কেউ টের পান না। ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের পর শ্রীমা সারদা দেবীর কাছে তিনি মন্ত্রদীক্ষা লাভ করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কেই স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “আমাদিগের ভিতর যদি সর্বতোভাবে কেহ কামজিৎ থাকে তো সে যোগীন।” স্বামীজীর কথায় তাঁর চোখটি ‘যেন জগন্নাথের চোখ’। আর ঠাকুরের কথায়, ‘অর্জুনের চোখের মতো।’ লক্ষ্যভেদী, তাঁর দেখা পেতেই হবে। শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘে তিনি ছিলেন ‘মাথার মণি’; রামকৃষ্ণ মিশনের সূচনালগ্নে প্রথম ভাইস-প্রেসিডেন্ট। ঠাকুরের অবতারত্ব বিষয়ে স্বামীজীর নিজেরই সন্দেহ আছে কিনা, খটকা লেগে সে বিষয়ে প্রশ্ন তুললে স্বামীজী তাঁকে খোলসা করে বলেছিলেন, “তোরা অবতার কি বলছিস, অবতার তো ছোট কথা, ঠাকুর যে বেদমূর্তি। আমি তাঁরই আদেশে কাজে নেমেছি।”
তথ্যসূত্র: শ্রীরামকৃষ্ণ-ভক্তমালিকা, স্বামী গম্ভীরানন্দ
শ্রীরামকৃষ্ণ-পার্ষদ স্বামী যোগানন্দ
ড. কল্যাণ চক্রবর্তী//


