দফায় দফায় সভা মুলতুবি হওয়ার কারণে সোমবার সুযোগ না পেলেও, মঙ্গলবার লোকসভায় কেন্দ্রীয় বাজেটের ওপর বক্তব্য রাখার সুযোগ পান তৃণমূলের সংসদীয় দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রায় ৪০ মিনিটের দীর্ঘ ভাষণে তিনি কেন্দ্রের ‘বঞ্চনা’ থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে মোদী সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন।
‘স্বনির্ভর বাংলা’ বনাম ‘আত্মনির্ভর ভারত’
বক্তৃতার শুরুতেই পশ্চিমবঙ্গের বকেয়া টাকা নিয়ে সুর চড়ান ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা ও সড়ক যোজনার বকেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“কেন্দ্র টাকা আটকে রাখলেও আমরা মানুষের হিসাব বুঝে নেব। প্রধানমন্ত্রী ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর স্লোগান দিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা গত দু’বছরে নিজস্ব কোষাগার থেকে প্রকল্প চালিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি ‘স্বনির্ভর বাংলা’ কাকে বলে।”
বাজেটের নতুন নাম: ‘লাইফটাইম ট্যাক্স ট্র্যাপ’
কেন্দ্রীয় বাজেটকে ‘শিরোনাম সর্বস্ব’ এবং ‘রবিনহুড মডেল’ বলে কটাক্ষ করেন অভিষেক। মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝার তীব্র সমালোচনা করে তিনি একে ‘আজীবন করের ফাঁদ’ (Lifetime Tax Trap) হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর যুক্তি ছিল:
- শিশুর জন্মের পর দুধ ও ডায়াপার থেকে শুরু করে শিক্ষা সামগ্রী— সব কিছুতেই কর দিতে হচ্ছে।
- চাকরি পেলে আয়কর, অসুস্থ হলে ওষুধে কর, এমনকি মৃত্যুর পর ধূপকাঠি কিনতেও কর দিতে হচ্ছে।
- এই বাজেট নিম্নবিত্তের থেকে শুষে নিয়ে ধনীদের স্বস্তি দেওয়ার কৌশল মাত্র।
‘দুই ভারত’-এর বৈপরীত্য
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের উপস্থিতিতেই অভিষেক মোদী জমানার ‘দুই ভারত’-এর চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন:
- একদিকে ‘সব কা সাথ সব কা বিকাশ’-এর বুলি, অন্যদিকে বাংলার প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া।
- একদিকে ‘বেটি বাঁচাও’-এর প্রচার, অন্যদিকে দেশে প্রতি ১৬ মিনিটে একজন নারী নিগৃহীত হচ্ছেন।
- একদিকে ‘এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত’, অন্যদিকে বাংলাভাষীদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে হেনস্থা করা হচ্ছে।
বিদেশনীতি ও এসআইআর ইস্যুতে প্রশ্ন
ভারত-মার্কিন বাণিজ্যিক সমঝোতা নিয়ে কেন্দ্রের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অভিষেক। মার্কিন কৃষিসচিবের দাবির কথা উল্লেখ করে তিনি জানতে চান, এই চুক্তিতে ভারতের কৃষকদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত। এছাড়া, রাজ্যে এসআইআর (SIR) সংক্রান্ত জটিলতায় ১৫০ জনের মৃত্যু ও কোটি মানুষের হেনস্থা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
কবিতার ছন্দে উপসংহার
বক্তৃতায় মহাত্মা গান্ধী, স্বামী বিবেকানন্দ ও আম্বেদকরকে উদ্ধৃত করার পাশাপাশি নিজের কাব্যিক সত্ত্বাকেও তুলে ধরেন তিনি। সোমবার এসআইআর নিয়ে কবিতা লেখার পর, মঙ্গলবার সংসদের বক্তৃতা শেষ করেন নবারুণ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত পংক্তি— ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ উদ্ধৃত করে।

