দেশপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেম অভিন্ন: শ্রীদেবানন্দজীর মধ্যে তার স্বরূপ সন্ধান করেছে ‘দেশের মাটি’।

রিষড়া, ৪ এপ্রিল। আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জগতে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ‘দেশের মাটি শীর্ষ সম্মান’ অর্পণ করা হয়েছে রিষড়া প্রেম মন্দির আশ্রমের বর্তমান তথা দ্বিতীয় অধ্যক্ষ শ্রীমৎ দেবানন্দ ব্রহ্মচারী মহারাজকে। ‘দেশের মাটি কল্যাণ মন্দির’ এদিন বাংলার বহু প্রবুদ্ধ সাধু-সন্তের উপস্থিতিতে ২০২৫ সালের জন্য এই সম্মান প্রদর্শন করেছে দেবানন্দজীর আশ্রমে গিয়ে। দেশের মাটি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে সন্ত সম্মেলনে উপস্থিত মহা-মণ্ডলেশ্বর স্বামী প্রজ্ঞানন্দ গিরি মহারাজ, জুনা আখড়া; স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী মহারাজ, শঙ্কর মঠ; স্বামী বলদেবানন্দ মহারাজ, সহ-অধ্যক্ষ, মাহেশ শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম; স্বামী শিবেশানন্দ মহারাজ, সম্পাদক, মাহেশ শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম এবং পূজ্যপাদ জগদার্তিহা দাস প্রভু সম্মিলিতভাবে মহারাজের করকমলে এই সম্মান তুলে দেন। সুচারু মানপত্র পাঠ করে, গেরুয়া শাল পড়িয়ে, নানান ফল-ফুল ও মালার সৌকর্যে মহারাজকে বিশেষ গরিমায় বরণ করে নেন দেশের মাটি কর্তৃপক্ষ। এই মহতী সভায় উপস্থিত ছিলেন ৫০ টি আশ্রম থেকে আগত পূজ্য সন্ত মহারাজ।

দেশের মাটি বিগত এক দশক ধরে নানাবিধ সেবাকাজ, ত্রাণকার্য, গৌরব-সম্পাদনী নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাহিত্য চর্চা, বিজ্ঞান আলোচনা, পূজাপার্বণ, সন্ত-সম্মান, বৌদ্ধিক সম্মেলন প্রভৃতি কার্যক্রম সাফল্যের সঙ্গে করে আসছে। এদিন এই সংগঠন একজন প্রেমময় সন্ন্যাসীকে তাদের তরফ থেকে শীর্ষ সম্মান দিয়ে বরণ করে নিয়ে বার্তা দিয়েছে, তারা যথাসম্ভব ধর্মীয় আধারেই তাদের দেশব্রতী কর্মযজ্ঞ সম্পাদনা করবে। কল্যাণ মন্দিরের পক্ষ থেকে এদিন আশ্রমে আসেন মহিষাদল গার্লস কলেজের
প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. উৎপল কুমার উত্থাসনী, নৈহাটি ঋষি বঙ্কিম মহাবিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. তপন চক্রবর্তী, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিক সুশান্ত মজুমদার, বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কল্যাণ চক্রবর্তী, দুর্গাপুরের প্রকৌশলী রাজ মুখার্জি, বরানগর থেকে বিধান সরকার, হুগলির উত্তরপাড়া থেকে মিতা রায় প্রমুখ। তারা একটি উল্লেখযোগ্য সময়ে শ্রীদেবানন্দজীকে উদ্দেশ্য করে মানপত্র পাঠ করেন, উপস্থাপন করেন মহারাজের দিব্যজীবন, দেশের মাটি কল্যাণ মন্দিরের কর্ম ও নীতি, সেই সঙ্গে মহারাজের সম্মানে আনা উপহার সামগ্রী পরম যত্নে চয়ন করে তুলে দেন সাধু-সন্তদের মাধ্যমে সম্মান প্রাপকের হাতে। সম্মান প্রদর্শন হতেই অনুষ্ঠানস্থলে মাতৃশক্তি উলুধ্বনি দিয়ে ওঠেন। এদিন সকাল ১১টায় সঙ্গীত পরিবেশনা ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে এই অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। সম্মান-প্রদর্শনের এই অনুষ্ঠান-পর্বটিতে সঞ্চালনা করেন সুশান্ত মজুমদার। মানপত্র পাঠ করেন ডঃ উৎপল কুমার উত্থাসনী।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শ্রীমৎ দেবানন্দ ব্রহ্মচারী মহারাজ আধ্যাত্মিক জগতের এক প্রেমময় সন্ন্যাসী, যাঁর চৈতন্যে দেশমাতা এবং আদ্যাশক্তি মিলেমিশে একাকার। তিনি ব্রহ্মজ্ঞানের সঙ্গে বাস্তববোধের সম্মিলন ঘটিয়েছেন যা দেশরক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষার পক্ষে ইতিবাচক। তাঁর সামীপ্যে ও সান্নিধ্যে এসে ভক্তবৃন্দ যেমন দেবত্বের পরশ পেয়েছেন, সঙ্গে অতিরিক্ত পেয়েছেন দেশসেবার প্রেরণা, হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করার দৃঢ় মানসিকতা।

১৯৪০ সালের ২৪ শে অক্টোবর এই মহান সন্ন্যাসীর জন্ম। পূর্বাশ্রমের নাম ভোলানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। জন্ম হাওড়া জেলার শিবপুরে; পিতা সুবোধচন্দ্র এবং মাতা তারা দেবী। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাণীবিদ্যায় স্নাতক হবার পর তিনি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ ও ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত গবেষক রূপে কাজ করেন। কর্মজীবনে একটি মহাবিদ্যালয়ে প্রাণীবিদ্যার অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি নর্মদা উপাসক, অনন্ত-বিভূষিত, সচল বৈদ্যনাথ শ্রীশ্রী বালানন্দ ব্রহ্মচারীজীর শিষ্যপরম্পরার শ্রীশ্রী তারানন্দ ব্রহ্মচারীজীর নিকট দীক্ষা ও ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করেন। শুরু হয় নতুন গবেষণা; প্রাণীবিদ্যার গবেষণা পর্যবসিত হল প্রাণ-চৈতন্য-বিজ্ঞানের গূঢ় গবেষণায়। যুক্ত হল বিশ্বজনীন প্রেম, দেশপ্রেম, ঈশ্বর প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রেম সবই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল, পেলেন পরমানন্দের সন্ধান।

তাঁর সম্পাদনায় পঞ্চাশ বছর ধরে প্রকাশিত হয়েছে ‘প্রেম প্রবাহ’ নামক ধর্ম ও সংস্কৃতির এক মহান মুখপত্র। বর্তমানে পত্রিকাটি ৫৪ বর্ষে পদাপর্ণ করেছে এবং আজও তিনি সেই পত্রিকার প্রকাশক এবং প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বহু প্রবন্ধের রচয়িতা; কিছু গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছে, বহু আলোচনাই রয়ে গেছে পত্রিকার পাতায় পাতায় এবং কিছুটা অন্তরালে ও। তাঁর উল্লেখযোগ্য কর্ম হচ্ছে ‘শ্রীতারানন্দ অবৈতনিক শিক্ষায়তন’ প্রতিষ্ঠা এবং ‘শ্রীদেবানন্দ বিদ্যাপীঠ’ সংস্থাপন, গ্রামের উন্নয়নবিষয়ক নানান প্রকল্প, গ্রাম দত্তক নিয়ে গ্রামবাসীর সার্বিক উন্নয়নের প্রচেষ্টা, নারীশক্তিকে স্বনির্ভর করার প্রয়াস, গ্রামে গ্রামে অন্নদান, বস্ত্রদান, শিক্ষাদান প্রভৃতি। তিনি হিন্দুসমাজকে সুসংগঠিত করার কাজও করে চলেছেন।

এমন একজন মৃত্তিকাশ্রয়ী সন্ন্যাসীকে এবার ‘দেশের মাটি কল্যাণ মন্দির’ তাদের শীর্ষ সম্মান প্রদান করতে পেরে আনন্দিত ও গর্বিত, জানিয়েছেন ‘দেশের মাটি’-র অন্যতম সংগঠক ড. কল্যাণ চক্রবর্তী। প্রেম মন্দির আশ্রমের সম্পাদক পূজ্যপাদ নির্গুণানন্দজী মহারাজ এদিন বলেন, দেশের মাটি-র এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় এবং খুব সুচারুভাবে অনুষ্ঠানটি ভাব-গম্ভীর ও ঐশী পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। কল্যাণ মন্দিরের সদস্য মিলন খামারিয়া জানান, এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি ছিল সত্যিই একটি স্মরণীয় ও সুন্দর আয়োজন। শ্রীমৎ দেবানন্দজী মহারাজের প্রতি আমাদের সকলের এক বিনীত সম্মান ও ভালোবাসার প্রকাশ। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে আরও অনেক ভালো কাজের জন্য তিনি আমাদের সকলের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।

শীর্য আচার্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.