চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’। সাধারণত ব্যাক্টেরিয়ার নাম শুনলে মানুষ আতঙ্কিত হলেও, এবার সেই ব্যাক্টেরিয়াকেই ক্যানসার নির্মূলের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াটারলু এবং আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি এই বিশেষ ব্যাক্টেরিয়া সুস্থ কোষের ক্ষতি না করে সরাসরি আক্রমণ করবে মারণ টিউমারকে।
ব্যাক্টেরিয়ার নাম: ক্লস্ট্রিডিয়াম স্পোরোজেনেস
গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা বেছে নিয়েছেন ক্লস্ট্রিডিয়াম স্পোরোজেনেস (Clostridium sporogenes) নামক এক বিশেষ ব্যাক্টেরিয়াকে। সাধারণত মাটিতে জন্মানো এই ব্যাক্টেরিয়ার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এরা অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে।
কীভাবে কাজ করবে এই পদ্ধতি?
ক্যানসার চিকিৎসার এই বিকল্প পদ্ধতিটি মূলত তিনটি ধাপে কাজ করে:
১. জিনগত পরিবর্তন: ল্যাবরেটরিতে এই ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি শরীরে ঢুকলে সাধারণ রোগ সৃষ্টি করবে না। ২. টার্গেট চেনা: টিউমার কোষগুলি যেখানে দ্রুত বৃদ্ধি পায়, সেখানে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয় (Hypoxia)। ক্লস্ট্রিডিয়াম ব্যাক্টেরিয়ার স্বভাবই হলো অক্সিজেনহীন জায়গা খুঁজে নেওয়া। ফলে এটি শরীরে প্রবেশের পর রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সটান ক্যানসার কোষের কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছায়। ৩. কোষ ধ্বংস: টিউমার কোষের ভেতরে ঢুকে এই ব্যাক্টেরিয়া দ্রুত বংশবৃদ্ধি শুরু করে। এর ফলে ক্যানসার কোষগুলি ফেটে যায় এবং তাদের অনিয়মিত বিভাজন বন্ধ হয়ে যায়। সহজ কথায়, ব্যাক্টেরিয়াটি ক্যানসার কোষগুলিকে ভেতর থেকে ‘আত্মসাৎ’ করে ফেলে।
কেমোথেরাপির বিকল্প?
বর্তমানে ক্যানসার মানেই যন্ত্রণাদায়ক কেমোথেরাপি এবং তার ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই ‘ব্যাক্টেরিয়া থেরাপি’ সফল হলে কেমোর প্রয়োজনীয়তা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি অনেকটা ইমিউনোথেরাপির মতো কাজ করে, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মারণ রোগের বিরুদ্ধে লড়তে শিখিয়ে দেওয়া হয়।
বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ইতিমধেই পশুর শরীরে এই পরীক্ষার ফল ইতিবাচক এসেছে। এখন মানবদেহে এই পদ্ধতির ট্রায়াল শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। এই প্রক্রিয়া যদি নিরাপদ প্রমাণিত হয়, তবে আগামী দিনে ক্যানসার নিরাময়ে এটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

