বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে আজ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমান্তরালে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল আলোচিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোট। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে সাংবিধানিক রূপ দিতেই এই দ্বৈত ভোটের আয়োজন করা হয়েছে।
ভোটের প্রস্তুতি ও ব্যালট বৈচিত্র্য
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি ভোটাররা জুলাই সনদের জন্য একটি পৃথক এবং রঙিন ব্যালট পেপার পাবেন। প্রবাসী ভোটারসহ চার শ্রেণির নাগরিকের জন্য পোস্টাল ব্যালটের সুবিধাও রাখা হয়েছে। এই গণভোটে ভোটারদের সামনে কেবল একটিই প্রশ্ন রাখা হয়েছে— “জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আপনার সমর্থন আছে কি না?” ভোটাররা কেবল ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ সূচক ভোট প্রদান করবেন।
কী আছে এই ‘জুলাই সনদে’?
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২৮ দফার এই ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন। এই সনদের মূল বিষয়গুলো হলো:
- ঐতিহাসিক স্বীকৃতি: জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং নিহতদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে ঘোষণা।
- রাজনৈতিক সমালোচনা: শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবুর রহমানের আমলকে ‘আওয়ামী স্বৈরাচার’ হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনেরও সমালোচনা করা হয়েছে এতে।
- প্রশাসনিক সংস্কার: সংবিধানে ৮৪ দফার প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাব, যার মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
গণভোটের চারটি প্রধান স্তম্ভ
সরকার ঘোষিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, যে চারটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই গণভোট হচ্ছে:
- প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন: নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদের প্রক্রিয়া অনুযায়ী গঠন।
- দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ: ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন (আনুপাতিক হারে) এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা।
- ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমাবদ্ধ করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচনের প্রস্তাব।
- ঐকমত্য বাস্তবায়ন: সংস্কারের যে ৩০টি প্রস্তাবে দলগুলো একমত হয়েছে, বিজয়ী দল বা জোট তা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে।
রাজনৈতিক অবস্থান ও বিতর্ক
এই গণভোট নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিএনপি দাবি করেছিল নির্বাচনের আগে যেন কোনো গণভোট না হয়, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের আগেই গণভোটের পক্ষে ছিল। শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পরামর্শে একই দিনে দুই ভোটের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
উল্লেখ্য যে, সংস্কারের কিছু বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মতো দলগুলো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত পোষণ করেছে। শুরুতে সরকার নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলেও, সম্প্রতি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন। তিনি বলেন, “‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে দেশ বৈষম্য ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।”

