ভারত-মার্কিন অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি: শুল্ক যুদ্ধের অবসান নাকি কৃষিক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ?

ভারত-মার্কিন অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি: শুল্ক যুদ্ধের অবসান নাকি কৃষিক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ?

বিশ্ব বাণিজ্যের আঙিনায় এক তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতায় পৌঁছাল ভারত। এই চুক্তির ফলে একদিকে যেমন ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়েছে ওয়াশিংটন, অন্যদিকে মার্কিন বাজারের বৃহত্তর সুবিধা পেতে নিজেদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র আংশিক উন্মুক্ত করতে হয়েছে নয়াদিল্লিকে। যদিও ভারতের দাবি, কৃষির ‘সংবেদনশীল’ সুরক্ষা বলয় এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

চুক্তির মূল শর্ত ও ভারতের প্রাপ্তি

দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন বাজারে ভারতীয় বস্ত্রশিল্প বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছিল। টেক্সটাইল পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক থাকায় ভারতীয় রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের গড় শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনছে আমেরিকা।

এর ফলে বস্ত্র, চামড়া, জুতো, প্লাস্টিক ও হস্তশিল্পের মতো শ্রমনিবিড় ক্ষেত্রগুলি সরাসরি উপকৃত হবে। বিশেষত বস্ত্রশিল্পের জন্য ১১,৮০০ কোটি ডলারের নতুন বাজার খুলে যাবে বলে আশা করছে কেন্দ্র। এ ছাড়াও ওষুধ, হিরে, মূল্যবান পাথর এবং বিমানের যন্ত্রাংশকে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে আমেরিকা।

কৃষিক্ষেত্রে উদ্বেগের মেঘ?

এই সমঝোতার বিনিময়ে আগামী পাঁচ বছরে আমেরিকা থেকে প্রায় ৪৫ লক্ষ কোটি টাকার ($500 billion) পণ্য আমদানিতে সম্মত হয়েছে ভারত। আমদানির তালিকায় রয়েছে খনিজ তেল, গ্যাস, বিমান ও যন্ত্রাংশ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত প্রযুক্তি পণ্য।

তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃষিক্ষেত্র। ভারত সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে যে ভুট্টা, চাল, গম, সয়াবিন, পোলট্রি ও দুগ্ধজাত পণ্যের (চিজ, দুধ) ওপর শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে। তাসত্ত্বেও বাদাম, তাজা ফল এবং পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত ডিডিজিএস (DDGS)-এর জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

সয়াবিন চাষিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই চুক্তিতে ভারতের সয়াবিন চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আমেরিকা থেকে সস্তা ‘ডিডিজিএস’ (ইথানল তৈরির অবশিষ্টাংশ যা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়) এবং কম শুল্কে সয়াবিন তেল আমদানি শুরু হলে দেশীয় সয়াবিন মিল এবং চাষিদের আয় কমতে পারে। বর্তমানে ভারতের মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ হয়, যা এই আমদানির ফলে প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।

রাজনৈতিক সংঘাত

এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পারদ চড়ছে। বিরোধী দল কংগ্রেস এই সমঝোতাকে ‘আত্মসমর্পণ’ বলে কটাক্ষ করেছে। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা অভিযোগ করেছেন, “এটি সমানে সমানে চুক্তি নয়, বরং ভারতকে মার্কিন পণ্যের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত করার ব্ল্যাকমেল।”

পাল্টা জবাবে বিজেপি জানিয়েছে, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর। সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলিকে সুরক্ষিত রেখেই এই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য বিরোধীদের দায়ী করেছে শাসক শিবির।

এক নজরে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সমঝোতা

বিষয়ভারতের সুবিধাভারতের ছাড়
পণ্যবস্ত্র, চামড়া, হস্তশিল্প, ওষুধ ও হিরেখনিজ তেল, গ্যাস, প্রযুক্তি পণ্য ও পশুখাদ্য
শুল্কগড় শুল্ক কমে ১৮% হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে ০%মার্কিন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আইসিটি পণ্যের বাধা অপসারণ
বাজার সুবিধাবস্ত্রশিল্পে ১১,৮০০ কোটি ডলারের সুযোগ৫ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মতে, এই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা দেশের ক্ষুদ্র শিল্পপতি, মৎস্যজীবী এবং উদ্যোগপতিদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে বিশ্বায়নের এই যুগে অভ্যন্তরীণ কৃষকদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন নয়াদিল্লির সামনে আসল চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.