চিনের হোটেলগুলোতে গোপন ক্যামেরার জাল: পর্যটকদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত এখন পর্ন সাইটে ‘লাইভ’

চিনের হোটেলগুলোতে গোপন ক্যামেরার জাল: পর্যটকদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত এখন পর্ন সাইটে ‘লাইভ’

পর্যটন বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে হোটেলে রাত কাটানো এখন চিনে রীতিমতো ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে জানা গেছে, চিনের বিভিন্ন হোটেলের ঘরে লুকিয়ে রাখা স্পাই ক্যামেরার মাধ্যমে অতিথিদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত বন্দি করে তা আন্তর্জাতিক পর্ন সাইট ও টেলিগ্রাম চ্যানেলে পাচার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চলছে সরাসরি ‘লাইভ স্ট্রিমিং’।

গ্রাহক থেকে শিকারে পরিণত হওয়ার মর্মান্তিক কাহিনি

হংকংয়ের বাসিন্দা এরিক (নাম পরিবর্তিত) দীর্ঘদিনের পর্ন আসক্ত ছিলেন। ২০২৩ সালের এক সন্ধ্যায় একটি পর্ন সাইটে ভিডিও দেখার সময় তিনি স্তব্ধ হয়ে যান। তিনি দেখেন, পর্দায় চলা ভিডিওর পাত্র-পাত্রী অন্য কেউ নন, স্বয়ং তিনি এবং তাঁর বান্ধবী। অতীতে দক্ষিণ চিনের শেনঝেনের একটি হোটেলে থাকাকালীন তাঁদের অজান্তেই সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছিল। এই ঘটনার পর এরিকের বান্ধবী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং দীর্ঘ সময় তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে।

কীভাবে চলছে এই নিষিদ্ধ কারবার?

চিনে পর্নোগ্রাফি উৎপাদন ও বিতরণ আইনত নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই স্পাই ক্যাম ব্যবসা ডালপালা মেলেছে।

  • গোপন ক্যামেরা: তদন্তে দেখা গেছে, বিভিন্ন হোটেলের ঘরে এমনভাবে ক্যামেরা লুকানো থাকে যা সাধারণ মানুষের পক্ষে ধরা অসম্ভব।
  • লাইভ স্ট্রিমিং: কিছু ওয়েবসাইট এমন ব্যবস্থা রেখেছে যেখানে গ্রাহকরা টাকা দিয়ে হোটেলের ঘরের লাইভ দৃশ্য দেখতে পান। অর্থাৎ দম্পতিরা ঘরে ঢোকা মাত্রই ক্যামেরা সক্রিয় হয়ে যায়।
  • পরিসংখ্যান: বিবিসির সাত মাসব্যাপী নজরদারিতে ৫৪টি গোপন ক্যামেরার সন্ধান মিলেছে, যেখানে মাত্র সাত মাসে প্রায় ১,০০০ জন অতিথির ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছে।

টেলিগ্রাম ও নিষিদ্ধ অ্যাপের রমরমা

চিনে টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ হলেও ভিপিএন ব্যবহার করে বহু মানুষ এই প্ল্যাটফর্মে পর্নোগ্রাফি কেনাবেচা করছে। তদন্তকারী সাংবাদিকরা ‘আকা’ (Aka) নামক এক এজেন্টের সন্ধান পেয়েছেন যার চ্যানেলে ১০ হাজারেরও বেশি সদস্য রয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে ওই চ্যানেলে ৬,০০০-এর বেশি ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। জানা গেছে, গত এক বছরেই ওই এজেন্ট ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা আয় করেছেন।

প্রশাসনের ভূমিকা ও সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন

২০২৪ সালের এপ্রিলে চিনা সরকার একটি নতুন নীতিমালা কার্যকর করেছে। যেখানে হোটেল মালিকদের জন্য ঘরগুলো নিয়মিত তল্লাশি করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নীতি খাতায়-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে তল্লাশির নামে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না, ফলে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা চরম সংকটে।

টেলিগ্রাম কর্তৃপক্ষ প্রথমে এই বিষয়ে উদাসীন থাকলেও, পরে প্রমাণ হাতে পেয়ে জানিয়েছে যে তারা এই ধরনের বেআইনি কন্টেন্টের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করে থাকে। সাংবাদিকরা যোগাযোগ করার পর অভিযুক্ত এজেন্ট ‘আকা’ তার অ্যাকাউন্টটি ডিলিট করে দিলেও, এই চক্রের জাল কতদূর বিস্তৃত তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.