দোল পূর্ণিমা তথা হোলি ভারতীয় সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা বহনকারী অনন্য উৎসব

দোল পূর্ণিমা তথা হোলি ভারতীয় সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা বহনকারী অনন্য উৎসব

ফরাসি বিপ্লবের পর পৃথিবীর সমস্ত দেশে সভ্য দেশ গঠনের জন্য সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা’র বাণী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মৈত্রী-ভ্রাতৃত্ব এর মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরের প্রতি বন্ধুভাব থাকলে ভাগের অংশে ঘাটতি পড়লেও বা সমাজের জন্য ব্যক্তি স্বাধীনতার কমতি হলেও হাসিমুখেই মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু বন্ধুভাব কে জাগ্ৰত করার জন্য, সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি কে কিভাবে একে অপরের সঙ্গে স্নেহের মাধ্যমে জুড়ে দেওয়া যায় তার পথ ভারতবর্ষ অনেক আগেই দেখিয়েছে। আর সেই বন্ধুভাব শুধুমাত্র অপর ব্যক্তি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না থেকে স্বয়ং ঈশ্বরে গিয়ে ঠেকে যা কিনা সমগ্ৰ সৃষ্টির প্রতিভূ। প্রকৃতির একজন ভোগী হিসেবে নিজেকে দেখলে তাকে ধ্বংস করতে মানুষ কুন্ঠাবোধ করে না কিন্তু প্রকৃতির অংশ হিসেবে, প্রকৃতির সন্তান হিসেবে নিজেকে জানলে প্রকৃতির রূপ-রস কে উদযাপন তথা আরাধনা প্রকৃতির ধ্বংস কে রোধ করে।

একদিকে বন্ধুভাবের চরম স্তর প্রেমাভক্তি আর অন্যদিকে প্রকৃতির রূপ কে উদযাপনের মাধ্যমে ঈশ্বর-তত্ত্বের উপলব্ধির উৎসব দোল পূর্ণিমা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকৃতিপ্রেমিক। প্রকৃতির মধ্যেই তাঁকে খোঁজেন, বসন্ত তাঁর অন্বেষণে সহায়তা করে —-
হিয়ায় হিয়ায় জাগল বাণী,
পাতায় পাতায় কানাকানি,
“ওই এল যে’, “ওই এল যে’
পরান দিল সাড়া।
এই তো আমার আপনারি এই
ফুল ফোটানোর মাঝে
তারে দেখি নয়ন ভ’রে
নানা রঙের সাজে।
বিবিধতার মধ্যে একতার সূত্র আবিষ্কার ভারতের সাধনা, প্রকৃতির মধ্যে যেমন রঙের বৈচিত্র্য তেমনি পরমসত্ত্বা কে উপলব্ধি করার বিভিন্ন পথ — তাই ভারতবর্ষ একটিমাত্র পুস্তক, একটিমাত্র উপাস্যে আটকে নেই। দোলপূর্ণিমা বিবিধতাকে আপন করে ভ্রাতৃত্ব প্রসারের উৎসব — সভ্য দেশগঠনের এই ভাবনা পৃথিবীর কোনো বিপ্লব দিতে পারে নি , দিয়েছে একমাত্র ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক আন্দোলন।
দোলপূর্ণিমা বাঙালি সমাজে কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়—এটি ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক ঐক্যের এক গভীর মিলনক্ষেত্র।

দোলপূর্ণিমা পালিত হয় ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার আবির–রঙ খেলার স্মৃতিতেই দোলযাত্রার সূচনা।এখানে ঈশ্বর ভয়ের নয়, আনন্দের ও প্রেমের রূপে প্রকাশিত। তার কেতাব অনুসারে না চললে ঈশ্বর এখানে শাস্তির বিধান দেন না বরং রাধা-কৃষ্ণ কে দোলনায় দুলিয়ে প্রথমে তাদের মূর্তিতে রঙ দিয়ে গোটা সমাজ মেতে ওঠে রঙ খেলায় —- একইসাথে ঈশ্বর আর তাঁর প্রতিটি অংশকে আপনার জন করার উৎসব।
বাংলায় দোলপূর্ণিমার প্রকৃত বিস্তার ঘটে মধ্যযুগে, বিশেষত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬–১৫৩৪) নবদ্বীপে ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে দোলকে জনপ্রিয় করে তোলেন।তাঁর প্রচারে হরিনাম সংকীর্তন, রাধাকৃষ্ণ প্রেমতত্ত্ব ও সমতার দর্শন দোলের মূল আত্মা হয়ে ওঠে। মূর্তি পূজার বিরোধীদের শাসনেও দোল উৎসবের মাধ্যমে ভারতের আধ্যাত্মিকতা বেঁচে থাকে আর সমাজ ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে এমনকি মোঘলদের মধ্যেও রঙের উৎসবের প্রচলন শুরু হয়। কিন্তু বামপন্থী ঐতিহাসিকদের ‘জিন্দাপীর’ ঔরঙ্গজেব রঙখেলা কে নিষিদ্ধ করে।
বাংলাদেশের শ্রীহট্ট, যেখানে শ্রী চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষদের ভিটেমাটি সেই বাংলাদেশের বেশিরভাগ জায়গায় এখন দোল উৎসব পালন ‘হারাম’। কাঁটাতারের এপারে পশ্চিমবঙ্গে মায়াপুর, নবদ্বীপে ইসকন মহাসমারোহে দোল পূর্ণিমা পালন করতে পারলেও ওপারে বাংলাদেশে ইসকনের শ্রী চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভু জামিনে মুক্ত আসামি।

জাতি, কুল, শ্রেণি নির্বিশেষে গ্রাম থেকে শহরে
সামাজিক দূরত্ব ভেঙে দেওয়ার এই উৎসবে সমাজের শক্তির জাগরণ ঘটাতেই মহাপ্রভু বৃন্দাবন থেকে এসে বাংলায় দোল উৎসব পালনে উৎসাহিত করেছিলেন। ভক্তির মাধ্যমে সমাজের শক্তিকে জাগরণের উপায় বলেছিলেন পুরুষসিংহ শ্রী চৈতন্যদেব।আবির, রঙ, মিষ্টি, বাদ্যযন্ত্রের বাজার চাঙ্গা হয় গ্রামীণ বাংলায় দোলকে কেন্দ্র করে ; যাত্রা ,পালাগান , কীর্তনের আসর লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা পায়।
পশ্চিমবঙ্গে দোলযাত্রা হিসেবে পালিত হলেও এর আর এক রূপ ‘হোলি’ ভারতের ইতিহাস কে , চিরাচরিত দুষ্টশক্তির দমনকে উৎসবের রূপ দেওয়ার প্রথা হোলির মাধ্যমে বজায় থাকে। হোলির আগের দিন রাতে হোলিকা দহনের মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীকী উদযাপন করা হয়।
অত্যাচারী রাজা হিরণ্যকশ্যিপুর বিরুদ্ধে ভক্ত প্রহ্লাদের বিশ্বাস ও ভক্তির জয়। হোলিকে ভারতের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করতে বামপন্থী লেখক-গবেষক শুধুমাত্র একে ‘বসন্তোৎসব’ বলে উপস্থাপনের চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু ভারতবর্ষ তাঁর সুদূর ইতিহাসের ঘটনাবলী কে এইভাবে স্মরণ করার যে পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে তা এই ধরনের চক্রান্তের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয় না। সপ্তম শতাব্দীতে লিখিত হর্ষবর্ধনের রত্নাবলীতে হোলিকোৎসবের কথা পাওয়া যায়। এমনকি মহাকবি কালিদাসের রচনাতেও আমরা হোলির কথা জানতে পারি। ভারতীয় সংস্কৃতির চিরন্তন প্রবাহ এই উৎসবগুলির মাধ্যমেই বজায় থেকেছে আর এইভাবেই ভারতের ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম জানতে পেরেছে। শুধু বৈষ্ণব সম্প্রদায় নয় , শৈব ও শাক্ত মতেও হোলি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। শিব কে পেতে মাতা পার্বতী কামদেবের সাহায্য প্রার্থনা করেন। কামদেব শিব কে কামনার তীর দিয়ে বিদ্ধ করলে মহাদেবের তৃতীয় নেত্রের ক্রোধাগ্নি কামদেব কে ভস্ম করে। কামদেবের স্ত্রী রতির সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে মহাদেব কামদেবের জীবন ফিরিয়ে দেন। ভারতের দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে এই ঘটনা স্মরণ করে হোলির আগের দিন রাতে ‘কামদহন’ পালন করা হয়। পাঞ্জাবে আট দিন ধরে হোলি পালন করা হয়। ১৮৩৭ সালে মহারাজা রঞ্জিত সিং এর হোলি উৎসবে ব্রিটিশ আধিকারিকরা অংশগ্রহণ করে। কোথাও আলপনা, কোথাও রঙ্গোলি, কোথাও চৌক-পুরানা নামে রঙের সজ্জা করা হয়। কর্ণাটকের হাম্পিতে পিচকারি দিয়ে হোলি খেলার ছবি অঙ্কিত আছে।
ভারতের মাটিতে জন্ম নেওয়া সব সম্প্রদায়ের মধ্যে দোল পূর্ণিমা তথা হোলি উৎসবের গুরুত্ব আছে। এই কারণেই বলা যায় দোল পূর্ণিমা আর হোলি উপাসনা পদ্ধতির গন্ডীকে অতিক্রম করে ভারতীয়ত্বের পরিচয়াক উৎসব।

পিন্টু সান্যাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.