প্রার্থী বাছাইয়ে নজিরবিহীন কড়াকড়ি বঙ্গ বিজেপিতে: ফোন জমা রেখে রুদ্ধদ্বার কক্ষে চলছে ‘গোপন’ ভোট

প্রার্থী বাছাইয়ে নজিরবিহীন কড়াকড়ি বঙ্গ বিজেপিতে: ফোন জমা রেখে রুদ্ধদ্বার কক্ষে চলছে ‘গোপন’ ভোট

আসন্ন নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায় চমক দিতে এবং কোনো প্রকার ঝুঁকি এড়াতে এক অভিনব ও কঠোর কৌশল অবলম্বন করল ভারতীয় জনতা পার্টি। লোকসভা বা বিধানসভা ভোটের আগে সাধারণত পেশাদার সংস্থা দিয়ে জনমত সমীক্ষা করানোর রেওয়াজ থাকলেও, এবার বঙ্গ বিজেপি প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সংগঠনের একদম নিচুতলার কর্মীদের সরাসরি ও গোপন মতামত গ্রহণ করছে। ‘জনপ্রিয়তা’কে একমাত্র মাপকাঠি করে এই বিশেষ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে জেলাগুলোতে।

কড়া নজরদারিতে গোপন ব্যালট

বিজেপির সাংগঠনিক জেলাগুলোতে প্রার্থী বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন করা হচ্ছে। সূত্রের খবর, রাজ্য সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) অমিতাভ চক্রবর্তী এবং ভিন রাজ্য থেকে আসা পর্যবেক্ষকরা এই প্রক্রিয়ার তদারকি করছেন। প্রক্রিয়াটি ঠিক এইরকম:

  • ফোন জমা রাখা: একটি নির্দিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিনিধিদের রুদ্ধদ্বার কক্ষে ডাকার পর প্রথমেই তাঁদের মোবাইল ফোন সুইচড অফ করিয়ে জমা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
  • ছাপানো ফর্ম: এরপর প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ‘ভারতীয় জনতা পার্টি, পশ্চিমবঙ্গ’ লেখা একটি বিশেষ ফর্ম।
  • পছন্দের তালিকা: ফর্মে তিনটি আয়তাকার খোপ দেওয়া থাকছে। সেখানে কর্মীদের তাঁদের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পছন্দের প্রার্থীর নাম লিখতে হচ্ছে।
  • গোপনীয়তা: একজনের ফর্ম যাতে অন্যজন দেখতে না পারেন, তার জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া থাকছে। ফর্মটি নির্দিষ্ট ভাঁজে মুড়ে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ফেরত নিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

কারা দিচ্ছেন এই মতামত?

এই সাংগঠনিক সমীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন মণ্ডলের বর্তমান ও প্রাক্তন সভাপতিরা এবং সংশ্লিষ্ট বিধানসভা এলাকার জেলাস্তরের বর্তমান ও প্রাক্তন পদাধিকারীরা। তবে একটি বিষয়ে কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে— পছন্দের প্রার্থীর তালিকায় কোনো প্রতিনিধি নিজের নাম লিখতে পারবেন না।

কেন এই অভিনব কৌশল?

বিজেপি নেতৃত্বের একাংশের মতে, গত নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোথাও নেতৃত্বের পছন্দ আবার কোথাও খ্যাতনামী বা সংগঠনের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ফলাফল বিপর্যয়কর হয়েছিল। এবার তাই:

১. জনপ্রিয়তাই শেষ কথা: পেশাদার সমীক্ষকদের তালিকায় যাঁদের নাম উঠে এসেছে, স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কেমন তা যাচাই করাই এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য। ২. দ্বিমুখী যাচাই: সাধারণ মানুষের সমীক্ষায় কেউ প্রথম হলেও যদি সংগঠনের বড় অংশ তাঁকে অপছন্দ করে, তবে বিকল্প নাম নিয়ে ভাবা হবে। ৩. বিপর্যয় রোধ: কোনো ‘ভুল’ প্রার্থী যাতে টিকিট না পান, তা নিশ্চিত করতে সংগঠনের একদম বুথ বা মণ্ডল স্তরের মেজাজ বুঝে নেওয়া হচ্ছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিল্লির হাতে

ইতিমধ্যেই দার্জিলিং ও শিলিগুড়ি বাদে রাজ্যের অধিকাংশ জেলায় এই সাংগঠনিক ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। জেলা থেকে সংগৃহীত এই মতামত এবং পেশাদার সংস্থার দেওয়া তথ্য মিলিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি হবে। তবে সূত্রের খবর, প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করার শেষ ক্ষমতা থাকবে কেন্দ্রীয় সংসদীয় বোর্ডের হাতে এবং চূড়ান্ত সিলমোহর দেবেন নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ।

এই নজিরবিহীন প্রক্রিয়া বঙ্গ বিজেপির ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। এর ফলে শেষ মুহূর্তে প্রার্থীতালিকায় কত বড় চমক থাকে, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.