কলকাতার শিক্ষা মানচিত্রে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ‘বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল’ ১০০ বছরে পদার্পণ করল। শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে সম্প্রতি প্রভাতী পদযাত্রা এবং প্রাক্তনীদের পুনর্মিলন উৎসবের মধ্য দিয়ে বছরভর অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছে। এই মাহেন্দ্রক্ষণে স্মৃতির সরণি বেয়ে ফিরে দেখা গেল বিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও এক প্রাক্তনী সাংবাদিকের জীবনকথায় উঠে আসা নানা অমলিন মুহূর্ত।
শৈশব ও একাল-সেকাল
ষাটের দশকের শুরুর দিকের কথা। শহর কলকাতা তখন আধুনিকতার পথে পা বাড়ালেও দক্ষিণ কলকাতার অনেক অংশই ছিল মফস্বলের মতো। সন্তোষপুরের খোয়া বিছানো রাস্তা আর ল্যাম্পপোস্টের টিমটিমে আলো ছাপিয়ে পড়াশোনার জন্য তৎকালীন সেরা ঠিকানা ছিল বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল। প্রাক্তনী অশোক সেনগুপ্ত স্মৃতিচারণ করে জানান, সেই সময়ে যাদবপুর বিদ্যাপীঠ ও সেন্ট লরেন্সের মতো নামী স্কুলে সুযোগ পেলেও আভিজাত্য ও শিক্ষার মানে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টই ছিল অভিভাবকদের প্রথম পছন্দ।
সত্যজিৎ রায়ের তুলিতে সেই হলঘর
বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ও ছিলেন এই স্কুলের ছাত্র। তাঁর ‘যখন ছোট ছিলাম’ স্মৃতিকথায় এই স্কুলের বর্ণনা বারবার উঠে এসেছে। স্কুলের বিখ্যাত সেই গ্যালারি দেওয়া হলঘর, যেখানে বাৎসরিক পুরস্কার বিতরণী থেকে সরস্বতী পুজোর পাত পেড়ে খাওয়া চলত, তার একটি স্কেচও এঁকেছিলেন তিনি। আজও সেই হলঘরটি স্কুলের ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
শিক্ষক ও শিক্ষার অন্দরমহল
নিমাই চক্রবর্তী, সুধীরবাবু, দেবব্রতবাবুর মতো শিক্ষকদের পাঠদান আজও প্রাক্তনীদের কানে বাজে। বিশেষ করে কবি কালিদাস রায়ের ‘ছাত্রধারা’ কবিতা বা রবীন্দ্রনাথের ‘ওরে সবুজ ওরে আমার কাঁচা’ পঙ্ক্তিগুলো যেভাবে শিক্ষকরা বুঝিয়ে দিতেন, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছেও শিক্ষণীয়। কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, সহমর্মিতা ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের এক অনন্য উদাহরণ ছিল এই বিদ্যাপীঠ।
একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনার উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়, এক সময়ের বাম আমলের দুই উচ্চপদস্থ পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তা (প্রসাদরঞ্জন রায় ও গৌতম মোহন চক্রবর্তী) তাঁদের প্রাক্তন শিক্ষক সুপ্রভাতবাবুর প্রয়াণের খবর পেয়ে ব্যস্ততার মধ্যেও ছুটে গিয়েছিলেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। গুরু-শিষ্যের এই অটুট বন্ধনই এই স্কুলের মূল চালিকাশক্তি।
কৃতি প্রাক্তনীদের দীর্ঘ তালিকা
এই স্কুলের প্রাক্তনীদের তালিকা বেশ দীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যময়। বিড়লা মিউজিয়ামের বিতর্ক সভা থেকে শুরু করে সাংবাদিকতার জগত— সর্বত্রই বালিগঞ্জের ছাত্রদের দাপট। প্রাক্তনীদের মধ্যে সুমন চট্টোপাধ্যায় ও সোমপ্রকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নামী সাংবাদিকরা যেমন রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন গৌতম ভট্টাচার্য, শম্ভু সেন ও সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।
‘কিচিরমিচির’ ও জীবনের এক্সট্রা ইনিংস
স্কুল ছেড়ে যাওয়ার কয়েক দশক পরেও বন্ধুত্বের বন্ধন আলগা হয়নি। ‘কিচিরমিচির’ নামক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে থাকা সহপাঠীরা আজও একে অপরের সঙ্গে জুড়ে আছেন। তবে সময়ের নিয়মে হারিয়ে গেছেন প্রিয় শিক্ষকরা, অনেকেই অসুস্থ। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে উঠে আসে সহপাঠী শিবাজীর প্রয়াণ কিংবা অসুস্থ বন্ধুর কথা। কেউ কেউ বলেন, “আমরা এখন জীবনের এক্সট্রা ইনিংস খেলছি।”
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ
শতবর্ষে এসেও স্কুলের জৌলুস কমেনি। দেওয়ালে নতুন অলংকরণ আর মেধা তালিকায় প্রাক্তনীদের সাফল্য আজও গর্বিত করে। তবে স্কুলের সংলগ্ন বেলতলা বস্তি এলাকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে বর্তমান ও প্রাক্তনীদের মনে।
শতবর্ষের এই মহতী আয়োজন কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এক শতাব্দীর ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার এক অঙ্গীকার।

