বিশ্বজুড়ে করোনা অতিমারির স্মৃতি এখনও ফিকে হয়নি। লকডাউন আর সংক্রমণের সেই বিভীষিকা কাটিয়ে যখন জনজীবন ছন্দে ফিরছে, ঠিক তখনই নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ‘অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা’ বা বার্ড ফ্লু। ভারতে এই ভাইরাসের সাম্প্রতিক উপস্থিতি এবং বিশ্বজুড়ে এর সংক্রমণের ক্রমবর্ধমান হার দেখে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি বার্ড ফ্লু-ই হতে চলেছে পরবর্তী কোনো বৈশ্বিক অতিমারির কারণ?
কী এই বার্ড ফ্লু? কেন এটি বিপজ্জনক?
বার্ড ফ্লু মূলত একটি ভাইরাসঘটিত সংক্রমণ যা সাধারণত পাখিদের মধ্যে দেখা যায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা’। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মধ্যে H5N1 স্ট্রেইনটি সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী। সাধারণত বুনো হাঁস বা গৃহপালিত মুরগির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। তবে বর্তমান উদ্বেগের প্রধান কারণ হলো, এই ভাইরাস এখন শুধু পাখিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরেও থাবা বসাচ্ছে।
ভারতে বর্তমান পরিস্থিতি ও সতর্কতা
ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে মাঝেমধ্যেই বার্ড ফ্লু-র প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে শীতকালে পরিযায়ী পাখিদের আগমনের ফলে সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়। পোল্ট্রি শিল্পে এর প্রভাব যেমন মারাত্মক, তেমনই মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ভয়ও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
জি নিউজ সূত্রে খবর, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ ইতিমধ্য়েই রাজ্যগুলিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে মৃত পাখির সংস্পর্শে না আসা এবং পোল্ট্রি পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী অতিমারির ‘টিকিং টাইম বম’?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বার্ড ফ্লু ভাইরাসের অতিমারি ঘটানোর সম্ভাবনাকে একেবারেই নাকচ করা যায় না। এর পেছনে রয়েছে তিনটি প্রধান কারণ:
- মিউটেশন বা রূপবদল: ভাইরাস ক্রমাগত নিজের গঠন পরিবর্তন করছে। যদি এটি মানুষের শরীর থেকে মানুষের শরীরে ছড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করে, তবে তা ভয়াবহ রূপ নেবে।
- স্তন্যপায়ী প্রাণীর সংক্রমণ: সম্প্রতি সিল, বিড়াল এমনকি ডলফিনের মধ্যেও এই ভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে। যা ইঙ্গিত দেয় যে ভাইরাসটি প্রজাতির দেওয়াল টপকে মানুষের আরও কাছাকাছি চলে আসছে।
- উচ্চ মৃত্যুহার: সাধারণ ফ্লু-এর তুলনায় H5N1 ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুহার অনেক বেশি।
উপসর্গ: যা দেখে সতর্ক হবেন
মানুষের মধ্যে বার্ড ফ্লু-র লক্ষণগুলো সাধারণ সর্দি-কাশির মতোই হতে পারে, যা অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করে:
- তীব্র জ্বর ও কাশি।
- গলা ব্যথা ও পেশিতে যন্ত্রণা।
- শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়া।
- চোখের সংক্রমণ বা কনজেক্টিভাইটিস।
প্রতিরোধে কী করণীয়?
আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাই এই সংক্রমণ রোখার সেরা উপায়। জি নিউজ পাঠকদের জন্য রইল কিছু জরুরি টিপস:
- সঠিকভাবে রান্না: মাংস ও ডিম উচ্চ তাপমাত্রায় ভালো করে সেদ্ধ করে খান। কাঁচা বা আধসেদ্ধ পোল্ট্রি পণ্য এড়িয়ে চলুন।
- পরিচ্ছন্নতা: কাঁচা মাংস ধরার পর ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
- দূরত্ব বজায় রাখা: মৃত বা অসুস্থ পাখির সংস্পর্শে যাবেন না। কোথাও অস্বাভাবিকভাবে পাখি মরতে দেখলে দ্রুত স্থানীয় প্রশাসনকে জানান।
- পেশাগত সুরক্ষা: যারা পোল্ট্রি ফার্মে কাজ করেন, তাদের মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। যদিও এখনও মানুষের থেকে মানুষে বড় আকারের সংক্রমণের প্রমাণ মেলেনি, তবুও ভ্যাকসিন গবেষণা ও নজরদারি জোরদার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

