পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দৃশ্যের সাক্ষী থাকল রাজনৈতিক মহল। সাধারণত প্রার্থীরা নিভৃতে বা অনাড়ম্বরভাবে দলীয় প্রতীক সংগ্রহ করলেও, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর হাতে প্রতীক তুলে দেওয়া হলো ঘটা করে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্য বা দেশ— কোনো প্রান্তেই এর আগে প্রার্থীর হাতে প্রতীক তুলে দেওয়ার এমন আনুষ্ঠানিক ‘শো’ দেখা যায়নি। আর এই ‘অভূতপূর্ব’ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিজেপি স্পষ্ট করে দিল যে, আসন্ন নির্বাচনে মমতাবিরোধী লড়াইয়ে শুভেন্দু অধিকারীই তাদের তুরুপের তাস।
নন্দীগ্রামে মনোনয়ন পেশ: শক্তিপ্রদর্শন ও সংহতি
সোমবার হলদিয়ায় বিপুল জনসমাগমের মধ্য দিয়ে নন্দীগ্রাম আসনের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেন শুভেন্দু অধিকারী। এই কর্মসূচিকে ‘বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ’ করে তুলতে কোনো খামতি রাখেনি বিজেপি।
- দিলীপ-শুভেন্দু রসায়ন: রথের আদলে তৈরি ট্রাকে শুভেন্দুর পাশে ছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। মিছিল চলাকালীন রাস্তার দু’ধারের ভিড়ে দিলীপ ঘোষের পুষ্পবৃষ্টি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বাড়তি উন্মাদনা তৈরি করে। এমনকি ভিড়ের উচ্ছ্বাস দেখে ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজেই সরে গিয়ে শুভেন্দুর পাশে দিলীপ ঘোষকে জায়গা করে দেন, যা দলের অভ্যন্তরীণ সংহতির এক শক্তিশালী বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জোড়া আসনে লড়াইয়ের নেপথ্য কাহিনী
রবিবার মুরলীধর সেন লেনে বিজেপির রাজ্য দফতরে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য আনুষ্ঠানিকভাবে শুভেন্দুর হাতে প্রতীক তুলে দেন। কেন শুভেন্দু এবার নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর— এই দুই আসনে প্রার্থী হলেন, তার ব্যাখ্যাও দেন শমীক। তিনি জানান, শুভেন্দু নিজেই মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ভবানীপুরে লড়াইয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে, নন্দীগ্রামের মানুষের আস্থার কথা মাথায় রেখে দল তাঁকে সেই কেন্দ্র থেকেও সরানোর ঝুঁকি নেয়নি।
ভবানীপুরে ‘শাহি’ ধামাকা?
আগামী ২ এপ্রিল ভবানীপুর কেন্দ্রের জন্য মনোনয়ন জমা দেবেন শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপি সূত্রের খবর, সেদিন তাঁর পাশে খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে দেখা যেতে পারে। যদিও দলের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, তবে শাহের উপস্থিতি ভবানীপুরের লড়াইকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। এছাড়া প্রচারের শেষ লগ্নে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রোড শো-ও ভবানীপুর স্পর্শ করবে বলে জানা গিয়েছে।
শাহের ‘চার্জশিট’ ও শুভেন্দু-তত্ত্ব
গত ২৮ মার্চ কলকাতায় তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ‘চার্জশিট’ পেশ করার সময় অমিত শাহ তাঁর বক্তৃতায় তিনবার শুভেন্দুর নাম উল্লেখ করেছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে, সেদিন অন্য কোনো রাজ্য নেতার নাম তাঁর মুখে শোনা যায়নি। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুখ্যমন্ত্রী মুখ’ ঘোষণা না করলেও, শাহের সেই বক্তব্য এবং বর্তমানের এই রাজকীয় প্রচারপরিকল্পনা প্রমাণ করে যে, শুভেন্দুই এখন বঙ্গ বিজেপির প্রধান সেনাপতি।
প্রতীক গ্রহণ থেকে মনোনয়ন— প্রতিটি ধাপেই শুভেন্দুকে মহিমান্বিত করে তুলে বিজেপি আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জার হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। ভবানীপুরের হাই-ভোল্টেজ লড়াই এখন স্রেফ একটি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট নয়, বরং বিজেপি বনাম তৃণমূলের মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

