নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে দেশবাসীকে বড় স্বস্তি দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সোমবার লোকসভায় তিনি ঘোষণা করেন, ভারত এখন কার্যত ‘মাওবাদী-মুক্ত’। এক সময় মাওবাদীদের অভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছত্তীসগঢ়ের বস্তার এখন ‘লাল সন্ত্রাস’ কাটিয়ে উন্নয়নের মূল স্রোতে ফিরেছে। শাহের কথায়, “আমি আজ বলতে পারি যে আমরা নকশাল-মুক্ত হয়ে গিয়েছি। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হলেই দেশবাসীকে তা সরকারিভাবে জানানো হবে।”
২০২৬-এর লক্ষ্যমাত্রা ও মাওবাদী নির্মূল অভিযান
২০২৪ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে ভারতকে মাওবাদী আতঙ্ক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা হবে। মঙ্গলবার সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে। তার আগে লোকসভায় শাহ মাওবাদী দমনে গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন:
- অভিযানের ফলাফল: গত দুই বছরে আধা-সামরিক বাহিনী ও রাজ্য পুলিশের যৌথ অভিযানে ৭০৫ জন মাওবাদী নিহত হয়েছেন এবং ২,২১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
- আত্মসমর্পণ: ৪,৮৩৮ জন মাওবাদী অস্ত্র ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন।
- শীর্ষ নেতৃত্ব: দেশের প্রায় সমস্ত প্রথম সারির মাওবাদী নেতা হয় নিহত হয়েছেন, না হয় আত্মসমর্পণ করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, মোদী সরকার ‘অস্ত্র ত্যাগ করলে আলোচনা, নতুবা কঠোর দমন’— এই নীতিতে বিশ্বাসী। যারা হিংসার পথ বেছে নেবে, তাদের কোনোভাবেই রেয়াত করা হবে না।
বস্তার মডেল: সন্ত্রাস থেকে বিকাশের পথে
বস্তার নিয়ে আলোচনার সময় শাহ জানান, লাল সন্ত্রাসের কারণেই ওই এলাকার আদিবাসীরা দীর্ঘকাল উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে নেওয়া পরিকল্পনার সুফল আজ মিলছে।
“বস্তারের প্রতিটি গ্রামে স্কুল তৈরির মাধ্যমে আমরা অভিযান শুরু করি। আজ সেখানে রেশন দোকান, পাকা রাস্তা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র পৌঁছে গিয়েছে। মাওবাদীদের ব্যবহৃত অস্ত্রের ৯২ শতাংশই পুলিশের থেকে লুট করা ছিল, কিন্তু সেই জোগান বন্ধ করে আমরা তাদের কোমর ভেঙে দিয়েছি।”
কংগ্রেস ও বামপন্থী মতাদর্শকে তোপ
মাওবাদী সমস্যার বিস্তারের জন্য কংগ্রেসের দীর্ঘ ৬০ বছরের শাসনকাল এবং বামপন্থী মতাদর্শকে সরাসরি দায়ী করেন অমিত শাহ। তাঁর অভিযোগ:
- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হলেও কংগ্রেস জমানায় একে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। শাহ দাবি করেন, ১৯৭০ সালে নির্বাচনী ফায়দা লুটতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই মতাদর্শকে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছিলেন।
- রাহুল গান্ধীকে আক্রমণ: লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকেও তীব্র আক্রমণ শানান শাহ। তাঁর দাবি, রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রায় কয়েকটি মাওবাদী সংগঠন যোগ দিয়েছিল এবং মাওবাদী নেতা হিডমার সমর্থনে ওঠা স্লোগানের মঞ্চেও রাহুলের উপস্থিতি ছিল।
উন্নয়নের পথে আদিবাসী সমাজ
কংগ্রেস জমানায় আদিবাসীদের অনুন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে শাহ বলেন, খোদ মনমোহন সিং মাওবাদকে দেশের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ বললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। বিজেপি সরকারের আমলেই আদিবাসী এলাকাগুলোতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ দারিদ্রের অন্ধকার থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
অমিত শাহের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

