সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই)-এর ক্যাম্পাসে রোববারের অপ্রীতিকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবারও চরম উত্তেজনা ও চর্চা অব্যাহত রইল। একদিকে কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে পড়ুয়া, শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) শাখা সংগঠন ‘অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত’ (এবিজিপি)। অন্যদিকে, এসআরএফটিআই ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বার্তার মাধ্যমে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা ও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন শিল্পী, পরিচালক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
গোলমালের সূত্রপাত
রবিবার সকালে এসআরএফটিআই-এর প্রেক্ষাগৃহে এবিজিপি (পশ্চিমবঙ্গ প্রান্ত)-র একটি সভার আয়োজন করা হয়। সংগঠনের দাবি, কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি নিয়েই সকাল ১০টা থেকে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়েছিল। তবে ক্যাম্পাসের ভেতরে একটি বেসরকারি সংগঠনকে সভা করার অনুমতি দেওয়া নিয়ে আপত্তি জানান পড়ুয়াদের একাংশ। তাঁরা প্রেক্ষাগৃহের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং রেজিস্ট্রারের কাছে জবাবদিহি চান।
এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করেই দু’পক্ষের মধ্যে বচসা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের রূপ নেয়। পড়ুয়া ও শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, এবিজিপির সদস্যরা তাঁদের ওপর চড়াও হয়ে হামলা চালিয়েছে। বিপরীতে, এবিজিপি নেতাদের দাবি, বহিরাগত ও মারমুখী পড়ুয়ারা তাদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালায়। ঘটনার পর ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের তরফে লিখিত অভিযোগ জানানো হলে পুলিশও স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে।
প্রেস ক্লাবে এবিজিপির সাংবাদিক সম্মেলন
মঙ্গলবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এবিজিপির প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, জরুরি পরিষেবা নম্বর ১১২-এ একাধিকবার ফোন করা হলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অনেক দেরি করেছে। সংগঠনের রাজ্য সাংগঠনিক প্রধান অঞ্জন সিংহ জানান, ফোন করার আধ ঘণ্টা পর মাত্র দুজন পুলিশ কর্মী পৌঁছান, যা উদ্ভূত পরিস্থিতির তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল ছিল। তবে প্রাথমিক গাফিলতি থাকলেও পরে গেট টপকে ভেতরে ঢুকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের তৎপরতার প্রশংসা করেছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পড়ুয়া, শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে আইনি পদক্ষেপ ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানানোর কথা বলেছে সংগঠনটি। বিক্ষোভকারী পড়ুয়াদের হাতে লাঠিতে পেরেক কিংবা লোহার রড থাকার অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বিষয়ে এবিজিপির রাজ্য সভাপতি পঙ্কজ রায় প্রশ্ন তোলেন, নিরাপত্তাকর্মী থাকা সত্ত্বেও ক্যাম্পাসে এসব অস্ত্র ঢুকল কীভাবে? সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে লাথি মারার ভিডিও প্রসঙ্গে সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে কেবল আত্মরক্ষার্থে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছিল।
ক্যাম্পাসে শিল্পীদের সংহতি ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
এ দিন এসআরএফটিআই ক্যাম্পাসের ভেতরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। গান, নাটক ও বক্তব্যের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে মুক্তচিন্তার পরিবেশ বজায় রাখার দাবি জানানো হয়।
চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব পায়েল কপাডিয়া, কিউ, আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত, বরুণ গ্রোভার ও ফারহা খাতুন সহ বহু বিশিষ্ট শিল্পী এক যৌথ বার্তায় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানান। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে পুলিশের উপস্থিতিতেও ছাত্রী ও পড়ুয়াদের ওপর শারীরিক নিগ্রহ ও ভয় দেখানোর প্রমাণ মিলেছে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি তোলেন তাঁরা।
প্রতিবাদ সভায় উপস্থিত ছিলেন অভিনেত্রী চৈতি ঘোষাল। তিনি পড়ুয়াদের ওপর সংঘটিত এই হিংসার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “যে প্রেক্ষাগৃহটি পড়ুয়াদের শিল্পচর্চা ও সৃষ্টিশীল কাজের মূল কেন্দ্র, সেটি কেন একটি বাইরের সংস্থাকে ভাড়া দেওয়া হলো?” মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং ক্যাম্পাসে ভয়মুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।

