নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক: বিরোধী শিবিরের আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক: বিরোধী শিবিরের আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কার্যপদ্ধতি, নির্বাচন কমিশনের ‘একতরফা’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভোটার তালিকা প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সরগরম জাতীয় রাজনীতি। এই বিতর্কিত আবহে শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে যৌথ রণকৌশল নির্ধারণে বুধবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। বৈঠক শুরুর আগেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলা দ্রুত শুনানির নির্দেশ দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বিরোধী শিবিরকে বড় আইনি স্বস্তি দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনে সংঘাত ও সুপ্রিম কোর্টের পদক্ষেপ

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কমিশনের অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশীকে অন্ধকাজে রেখে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মূলত ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, বেআইনিভাবে ৬ নম্বর ফর্মের বয়ান বদল এবং বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় নাম সংযোজন বা বিয়োজনের মতো বিষয়ে সঁধু ও জোশী গত ১০ মাসে অন্ততঃ ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন। দুই কমিশনারের অভিযোগ, আইন অনুযায়ী ভোটার তালিকা তৈরির দায়িত্ব স্থানীয় নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকদের (ইআরও) ওপর থাকলেও, কমিশনের আইটি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্নার নিয়ন্ত্রণে ‘ইসিআইনেট’ (ECINET) সফটওয়্যারের মাধ্যমে গোটা প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

এই একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে আবেদন জানান আইনজীবী বিকাশ সিংহ ও শৈলেন্দ্র মনি ত্রিপাঠী। শীর্ষ আদালত মামলাটি আগামী সপ্তাহে দ্রুত শুনানির জন্য গ্রাহ্য করেছে। পিটিশনে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলি বাতিল করা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৯৯৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং ২০২৩ সালের সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনে সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে নেওয়া বাধ্যতামূলক।

কমিশনের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, মতপার্থক্য থাকলেও সিদ্ধান্ত ঐকমত্যের ভিত্তিতেই গৃহীত হয়। কিন্তু বিরোধী দলগুলি এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা দাবি করেছে।

মহারাষ্ট্র ও গোয়ার ঘটনায় গভীরতর প্রশ্ন

সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) এস চোকলিঙ্গম কমিশনের শীর্ষ স্তরে চিঠি দিয়ে ইসিআইনেট সফটওয়্যারে পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। সেখানে গত ৩১ আগস্ট প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় ২১.১ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। চোকলিঙ্গম আবেদন করেছেন, অসুস্থ, বয়স্ক বা উপযুক্ত তথ্য প্রদানকারী ভোটারদের ক্ষেত্রে ইআরও-দের বিশেষ ছাড় দেওয়ার বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

অন্যদিকে, গোয়াতেও সফটওয়্যার সংক্রান্ত জটিলতায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও ৯৭ জন যোগ্য ব্যক্তি ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশ।

‘ইন্ডিয়া’ জোটের সভার রূপরেখা ও অনুপস্থিতি

বুধবারের দিল্লি বৈঠকে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত থাকছেন। দিল্লি পৌঁছে তিনি নির্বাচন কমিশনের এই কার্যকলাপকে ‘জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে চিহ্নিত করেন। তবে এই জোট বৈঠকে অনুপস্থিত থাকছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল:

  • ডিএমকে: তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনের পর সহযোগী কংগ্রেস টিভিকে (TVK)-র সাথে জোট করায় ডিএমকে প্রধান এমকে স্ট্যালিন জোট ছাড়ার ঘোষণা করেন।
  • আম আদমি পার্টি (আপ): দিল্লি ও আসন্ন পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকায় অরবিন্দ কেজরীওয়ালের দল বৈঠকে থাকছে না।
  • অন্যান্য: ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ব্যক্তিগত কারণে অনুপস্থিত থাকতে পারেন। পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশে আসন সমঝোতা নিয়ে অসন্তোষের কারণে সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রধান অখিলেশ যাদব স্বয়ং উপস্থিত না থেকে প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন বলে সূত্রে জানা গিয়েছে।

তবে আপ এবং ডিএমকে উভয় দলই সংসদের উভয় কক্ষে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পেশ হতে চলা ইমপিচমেন্ট বা অপসারণ প্রস্তাবে স্বাক্ষর করবে বলে নিশ্চিত করেছে।

রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ

কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে তোপ দেগে অভিযোগ করেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোদী সরকারের নির্দেশে কাজ করছেন। খড়্গে ভোটার তালিকায় পরিবর্তন প্রকাশ করা ও বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় সুযোগ দেওয়া সহ ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন। দিল্লিতে বাম দলগুলি এবং কলকাতায় আইএসএফ প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

অন্যদিকে, রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতাকে নিশানা করার পাশাপাশি মমতার দিল্লি সফর প্রসঙ্গে তোপ দেগেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি এই বিরোধী বৈঠককে কটাক্ষ করে মন্তব্য করেন, বিরোধীদের এই উদ্যোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং এটি কোনো ফল আনবে না।

সুপ্রিম কোর্টের আগামী সপ্তাহের শুনানি এবং বিরোধী জোটের যৌথ পদক্ষেপ দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে চলা এই জাতীয় বিতর্ককে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.