কেন্দ্রীয় মাদকবিরোধী আইনের সঙ্গে সংঘাতের জেরে রাজ্য সরকারের বহু আলোচিত ‘গুন্ডাদমন বিল’ পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠিয়েছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি এই পদক্ষেপ করেছেন বলে জানা গিয়েছে। বিলটি ফেরত আসায় স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে রাজ্য সরকার। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।
কেন্দ্রীয় আইনের সঙ্গে সংঘাত ও রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত
কেন্দ্রীয় সরকারের পাঠানো নোট অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও অসামাজিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬’-এর অনুচ্ছেদ বি-তে ‘ন্যাশনাল ড্রাগ অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস্ অ্যাক্ট, ১৯৮৫’ (এনডিপিএস)-এর আওতাধীন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিলে এই ধরনের ব্যক্তিদের নিবর্তনমূলক আটকের যে বিধান রাখা হয়েছে, তা অপর একটি কেন্দ্রীয় আইন ‘প্রিভেনশন অফ ইল্লিসিট ট্রাফিক ইন নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস্ অ্যাক্ট, ১৯৮৮’ (পিআইটিএনডিপিএস)-এর পরিপন্থী।
কেন্দ্রীয় আইনে মাদক কারবারিদের প্রতিরোধমূলক সশ্রম সাজার সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ইতিমধ্যেই বলবৎ রয়েছে। ফলে রাজ্য সরকার এই বিলে মাদক অপরাধ অন্তর্ভুক্ত করায় একটি সমান্তরাল আইনি পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে, যা ভারতীয় সংবিধানের ২৫৪ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইনি দ্বৈততা এড়াতে বিলের নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ থেকে মাদক সংক্রান্ত ধারাটি বাদ দিয়ে সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্যের এক আমলার মতে, এটি সরকারের জন্য একটি সাময়িক ধাক্কা। তবে কেন্দ্রীয় আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে বিলটি পুনরায় বিধানসভায় পাস করানোর পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানোর পথ খোলা রয়েছে।
বিলের পটভূমি ও আইনি জটিলতা
অসামাজিক কার্যকলাপ দমনের উদ্দেশ্যে গত জুন মাসে এই নতুন বিলটি বিধানসভায় পেশ করেছিল রাজ্য সরকার। বিলটিতে ‘গুন্ডা’র সংজ্ঞা নির্ধারণের পাশাপাশি জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার বা ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকের আদেশে নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা থেকে বহিষ্কার বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছিল।
অতীতে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে, বিলে রাজ্যপাল সই করেছেন এবং তা আইনে পরিণত হয়েছে। এমনকি গত ২৪ জুলাই একটি মিছিলে হিংসায় জড়িতদের বিরুদ্ধে এই ‘আইন’ প্রয়োগের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু কলকাতা হাই কোর্টে রাজ্য সরকার স্বীকার করে যে, বিলটি তখন রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। বিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া তিনটি জনস্বার্থ মামলা গত ৬ অগস্ট খারিজ করে দিয়ে হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, রাষ্ট্রপতির সম্মতি না মেলায় বিলটি ‘প্রিম্যাচিয়োর’।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও পালটা তোপ
রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্তকে হাতিয়ার করে শাসকদলকে তীব্র আক্রমণ করেছে বিরোধীরা।
- অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়: সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ করে তিনি লেখেন, “ডবল ইঞ্জিন শুধু পোস্টারে। রিভার্স গিয়ারে রয়েছে সরকার। সংশোধনের জন্য হোমওয়ার্কের প্রয়োজন।”
- কুণাল ঘোষ ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়: বিরোধীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কটাক্ষ করে বলেন, “ভাগ্যিস রাষ্ট্রপতি এই বিলে সই করেননি। না-হলে ওই আইনের জন্য আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকেই জেলে যেতে হত।”
- শুভঙ্কর সরকার (কংগ্রেস): রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করার জন্যই এই আইন আনার চেষ্টা হচ্ছিল।
- সুজন চক্রবর্তী (সিপিএম): সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলার প্রবাদের মতো এটি ‘ফাঁকা কলসির আওয়াজ’। বার বার ধাক্কা খাওয়ার পরেও এদের শিক্ষা হচ্ছে না।
বিরোধীদের এই সমস্ত সমালোচনার পাল্টা জবাব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সাফ জানিয়েছেন, যারা ভয় পেয়েছে তারাই এই ধরনের লেখালেখি করছে। তাঁর স্পষ্ট মন্তব্য, “গুন্ডারা ভয় পেয়েছে তাই পোস্ট করছে। করতে দিন ওদের। বাকিটা আমরা বুঝে নেব। আমরা যা করি আইন মেনে করি। এখনও পর্যন্ত যা বলেছি, তাই করেছি। তাই করবও। যারা গুন্ডা, তারা জেলে থাকবেই।”

