তৃতীয় বারের জন্য ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদে নিযুক্ত হলেন অমিতাভ চক্রবর্তী। একটানা তৃতীয় বারের এই নিযুক্তি প্রমাণ করে যে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে তাঁর ওপর সাংগঠনিক ‘আস্থা’ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে গত কয়েক বছর ধরে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) হিসেবে অমিতাভের পাশাপাশি বাংলার সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলানো সতীশ ঢোন্ডকে মহারাষ্ট্রে বদলি করা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে এ রাজ্যের সংগঠনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এককভাবে অমিতাভের হাতেই সঁপে দিল দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
কেন্দ্রীয় স্তরে রদবদল ও নতুন দায়িত্ব বণ্টন
বৃহস্পতিবার দুপুরে বিজেপির সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্তর এবং বিভিন্ন রাজ্যের সংগঠন সম্পাদকদের নতুন তালিকা অনুমোদিত ও প্রকাশ করা হয়। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদে যে বিএল সন্তোষই বহাল থাকছেন, তা সভাপতি নীতিন নবীন-এর নতুন কমিটি ঘোষিত হওয়ার সময়ই স্পষ্ট হয়েছিল। বৃহস্পতিবার তাঁর সহকারীদের নাম প্রকাশ করা হয়।
কেন্দ্রীয় স্তরে এতদিন বিএল সন্তোষের সঙ্গে একমাত্র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) হিসেবে দায়িত্ব সামলাতেন শিবপ্রকাশ। তবে এবারের রদবদলে ওই পদে নতুন মুখ হিসেবে ফিরেছেন সৌদান সিংহ। অতীতে রামলাল যখন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) ছিলেন, তখন এই পদে ছিলেন সৌদান সিংহ, শিবপ্রকাশ, সন্তোষ এবং ভি সতীশ। পরবর্তী সময়ে রামলাল সঙ্ঘে ফিরে গেলে সন্তোষ সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হন এবং শিবপ্রকাশকে একমাত্র যুগ্ম সংগঠন সম্পাদক রাখা হয়। বর্তমান রদবদলে সৌদান ও সতীশ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরেছেন। সৌদান সিংহ সর্বভারতীয় যুগ্ম সংগঠন সম্পাদক হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার দায়িত্ব পেয়েছেন। অন্যদিকে ভি সতীশকে তফসিলি মোর্চা এবং সংসদীয় দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অমিতাভেই ভরসা রাখল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব
পশ্চিমবঙ্গে সংগঠনের নিয়মানুযায়ী, সাধারণত নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতে হলে আগে যুগ্ম সংগঠন সম্পাদক হিসেবে এনে তাঁকে ৬ মাস বা এক বছর কাজ শেখানো হয়। অমিতাভের সঙ্গে এতদিন সতীশ ঢোন্ড যুগ্ম সংগঠন সম্পাদক থাকলেও তিনি বাঙালি নন এবং বাংলা ভাষাও পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেননি। ফলে অমিতাভের বিকল্প হিসেবে তাঁকে ভাবা সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত সতীশকে মহারাষ্ট্রে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, সঙ্গে তাঁকে গুজরাত, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের ‘জনজাতি সম্পর্ক’ সামলানোর দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। সতীশ এতদিন কিছু জেলা দেখভাল করলেও, এখন থেকে বাংলার ৪৩টি সাংগঠনিক জেলার প্রতিটিই সরাসরি অমিতাভ চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
সাধারণত বিজেপিতে সভাপতি পদে দুবারের বেশি থাকার নিয়ম না থাকলেও, সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদে অমিতাভ চক্রবর্তী টানা তৃতীয়বারের জন্য দায়িত্ব পেলেন। ২০১৯ সালে ভুবনেশ্বর থেকে যুগ্ম সংগঠন সম্পাদক হয়ে কলকাতায় এসেছিলেন তিনি। ২০২০ সালে সুব্রত চট্টোপাধ্যায়ের স্থানাভিষিক্ত হয়ে তিনি পূর্ণাঙ্গ সংগঠন সম্পাদকের দায়িত্ব পান এবং ২০২০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদ পূর্ণ করেন। ২০২১ এবং ২০২৬ সালের গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনেও তাঁর তত্ত্বাবধানেই রাজ্যের সংগঠন কাজ করেছে। বিধানসভা ভোটে বাংলায় দলের ব্যাপক সাফল্যের পর তাঁকে পরিবর্তন করা হবে কি না তা নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অমিতাভ চক্রবর্তীর ওপরেই আস্থা বজায় রাখলেন।
উল্লেখ্য, রাজ্যে এর আগেও দীর্ঘমেয়াদী সংগঠন সম্পাদক থাকার নজির রয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর দেবব্রত সিংহ এবং ২০০৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত অমলেন্দু চট্টোপাধ্যায় এই পদে একটানা দায়িত্ব সামলেছেন। এরপর সুব্রত চট্টোপাধ্যায় প্রায় চার বছর এই পদে ছিলেন। এবার সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের পথেই পা বাড়িয়ে নিজের ‘তৃতীয় ইনিংস’ শুরু করলেন অমিতাভ চক্রবর্তী।

