১৯ অগস্টের রেশ কাটতে না কাটতেই বৃহস্পতিবার দিনভর নানা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও উত্তেজনায় সরগরম রইল প্রাচীন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামবদলের প্রস্তাব থেকে শুরু করে শিক্ষক ও কর্মীদের চিহ্নিত করে শাস্তির হুঁশিয়ারি, মনীষীদের ছবি টাঙানো এবং দেওয়াললিখন নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নামবদলের বার্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিগুণা সেন মঞ্চে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনাসভার শেষে যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় দাবি করেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন হওয়া উচিত। তিনি বলেন, “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ঋষি অরবিন্দ। তিনি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বাঙালিমেধার স্ফুরণ ঘটানোর জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ঋষি অরবিন্দের নামেই হওয়া উচিত বলে অনেক রাষ্ট্রবাদী মানুষ মনে করছেন। তাই আমরা প্রয়োজনে গণস্বাক্ষর সংবলিত দাবিপত্র পেশ করব রাজ্যপালের কাছে বা কেন্দ্রের কাছে।”
‘জাতীয়তাবাদ ও আধুনিক ভারত’ বিষয়ক এই আলোচনাসসভায় উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও বরেণ্য অতিথিদের মধ্যে অনুপস্থিত ছিলেন স্বপন দাশগুপ্ত ও শমীক ভট্টাচার্য। তবে উপস্থিত ছিলেন রাহুল সিংহ ও শর্বরী মুখোপাধ্যায়।
শিক্ষক ও কর্মীদের নিশানা রাহুল সিংহের আলোচনাসভার মঞ্চ থেকেই কড়া হুঁশিয়ারি দেন বিজেপি নেতা রাহুল সিংহ। তিনি দাবি করেন, ভারতবিরোধী শক্তি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে শেষ করে দিয়েছে এবং এর সঙ্গে কিছু শিক্ষক-অধ্যাপক ও কর্মী জড়িত। রাহুল বলেন, “বিশ্বের মধ্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য ছিল। ভারতবিরোধী শক্তি এখানে ঢুকে বিশ্ববিদ্যালয়কে শেষ করে দিয়েছে, এর সঙ্গে কিছু শিক্ষকও জড়িত। সেই সব শিক্ষক-অধ্যাপককেও আমরা চিহ্নিত করছি। কিছু কর্মীও রয়েছেন। তাঁদেরও চিহ্নিত করছি।” এই চিহ্নিত কর্মী ও শিক্ষকদের শিক্ষা দেওয়া হবে বলে দাবি করেন তিনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে রাহুল বলেন, “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনও ভাবে মাওবাদী, নকশালবাদী এবং ভারতবিরোধী শক্তির ডেরা হতে দেব না। মমতা মুখে বলেছিলেন, কিন্তু কাজে করেননি। তলায় তলায় মাওবাদীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। বিজেপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পার্টি নয়। আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে আলোচনাসভা করলাম। আজকে মিছিল হল, বন্দে মাতরম্ হল, জাতীয় পতাকা উঠল।”
মনীষীদের ছবি ও এবিভিপি-র মিছিল আলোচনাসভার আগে এবিভিপি-র সদস্যেরা ক্যাম্পাসে ‘বন্দে মাতরম্’ মিছিল করেন। এরপর ক্যাম্পাসের নানা দিকে ঋষি অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি টাঙানো হয়। এবিভিপি সদস্য আদিত্য মণ্ডল জানান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উৎকর্ষকেন্দ্রে রবীন্দ্রনাথ ও বিদ্যাসাগরের ছবিই থাকা উচিত এবং এর মাধ্যমে তাঁরা যাদবপুরের ‘লাল আবহাওয়া’ কাটিয়ে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা আনতে চান।
দেওয়াললিখন ও চিত্তপ্রসাদের ছবি মোছা ঘিরে বিতর্ক এর আগে মঙ্গলবার মাঝরাতে যাদবপুর ক্যাম্পাসে ঢুকে সমস্ত দেওয়াললিখন মুছে ফেলার অভিযোগ ওঠে কলকাতা পুরসভা ও পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় চুনকামে মুছে যায় বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের একটি ছবি, যা নিয়ে সমাজমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। মন্বন্তরের ছবি আঁকা চিত্তপ্রসাদের ছবি মুছে ফেলাকে বাঙালিসত্তায় আঘাত বলেই মনে করছিলেন অনেকে। বুধবার উপাচার্য জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। তবে বৃহস্পতিবার সকালেই দেখা যায়, সেই চুনকাম করা দেওয়ালেই আবার ফিরে এসেছে হিটলার, মুসোলিনি ও আরএসএস-কে নিশানা করা বিভিন্ন স্লোগান, যা নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। তবে এই দেওয়াললিখন কারা করেছে, তা জানা যায়নি।
অটলবিহারী বাজপেয়ীর ছবিযুক্ত ব্যানার বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে দক্ষিণপন্থী কর্মী সংগঠনের আগের একটি ব্যানারের পাশেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর ছবিযুক্ত নতুন একটি ব্যানার দেখা যায়। সেই ব্যানারে ফিলিস্তিন ও ইজ়রায়েল সম্পর্কিত অটলজির একটি উদ্ধৃতি এবং সম্পূর্ণ বক্তৃতা শোনার জন্য একটি ইউটিউব লিঙ্কের কিউআর কোড রাখা ছিল। ‘যাদবপুরের রাষ্ট্রবাদী ছাত্ররা’ এই প্রচারের দায়িত্বে রয়েছে বলে ব্যানারে দাবি করা হলেও, এই ব্যানারটি তৈরিতে প্রকৃতপক্ষ কারা যুক্ত, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে এবং কোনো পক্ষই এর দায় স্বীকার করেনি।

