উৎসবের মরসুমের আগেই রাজ্যের সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জন্য বড় সিদ্ধান্ত নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আগামী ১ অক্টোবর, ২০২৬ থেকে সংশোধিত ৩৮ শতাংশ হারে মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) কার্যকর করার আনুষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে অর্থ দফতর। মঙ্গলবার অর্থ দফতরের (অডিট ব্রাঞ্চ) অতিরিক্ত প্রধান সচিব পি কে মিশ্রের স্বাক্ষরিত একটি নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
রাজ্যের বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ২০ শতাংশ ডিএ প্রদানের কথা ঘোষণা করেছিলেন, যা প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী নভেম্বর মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তবে সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে পুজোর পূর্বেই রাজ্য সরকারি কর্মীদের এই বর্ধিত মহার্ঘ ভাতা প্রদান করা হবে। মঙ্গলবারের সরকারি নির্দেশিকা সেই ঘোষণারই প্রশাসনিক রূপায়ণ।
কারা পাবেন এই বর্ধিত সুবিধা?
অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই নতুন হারের মহার্ঘ ভাতা কেবল রাজ্যের পূর্ণ সময়ের সরকারি কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। নিম্নে উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলিতেও এটি সমভাবে প্রযোজ্য হবে:
- সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী।
- পঞ্চায়েত (পঞ্চায়েত কর্মী-সহ), পুর নিগম, পুরসভা এবং অন্যান্য স্থানীয় সংস্থার কর্মচারী।
- বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি আন্ডারটেকিংয়ের কর্মীবৃন্দ।
এর পাশাপাশি, লক্ষ লক্ষ পেনশনভোগী ও ফ্যামিলি পেনশনভোগীদের জন্য মহার্ঘ ত্রাণ (ডিআর) বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ১ অক্টোবর, ২০২৬ থেকে সংশোধিত বেসিক পেনশন বা ফ্যামিলি পেনশনের উপর ৩৮ শতাংশ হারে ডিআর প্রদান করা হবে। নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কলকাতার জন্য বিভিন্ন সরকারি ব্যাঙ্ক এবং জেলাগুলির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের নির্দেশ অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল (এঅ্যান্ডই) প্রদেয় ডিআর-এর হিসাব প্রক্রিয়া সম্পাদন করবেন।
অসংশোধিত বেতন কাঠামো ও দিনমজুরদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন
যে সকল কর্মী এখনও পঞ্চম বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অসংশোধিত (প্রি-রিভাইজড) বেতন কাঠামোয় রয়েছেন, তাঁদের ডিএ-র হার ১৭১ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে একধাক্কায় ২২৩ শতাংশ করা হয়েছে। একইভাবে, রোপা ২০০৯ অনুযায়ী অসংশোধিত পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও ডিআর ১৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২৩ শতাংশ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া, ন্যূনতম মজুরি আইনের বাইরে থাকা সরকারি দিনমজুরদের (ডেইলি রেটেড ওয়ার্কার) দৈনিক মজুরিতে ১১০ টাকা অ্যাড-হক বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে।
খরচ বহন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া
অর্থ দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, স্বশাসিত সংস্থা বা সরকারি আন্ডারটেকিংগুলিকে বর্ধিত ডিএ ও ডিআর-এর খরচের দায়িত্ব নিজস্ব তহবিল বা বাজেট বরাদ্দ থেকে বহন করতে হবে; এর জন্য আলাদা কোন আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে না। সমস্ত হিসাব নিকটতম পূর্ণসংখ্যায় (রাউন্ড অফ) হিসাব করা হবে।
ইতিমধ্যেই এই নির্দেশিকা প্রশাসনিক স্তরে কার্যকরের জন্য বিভাগীয় কমিশনার, জেলাশাসক, জেলা বিচারক, পুলিশ সুপার, মহকুমাশাসকসহ পে অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিস ও বিভিন্ন ট্রেজ়ারিতে পাঠানো হয়েছে। ট্রেজ়ারি ও সাব-ট্রেজ়ারি অফিসাররা অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের (এঅ্যান্ডই) নির্দেশিকার অপেক্ষা না করেই দ্রুত এটি কার্যকর করতে পারবেন।
কর্মী সংগঠনগুলির প্রতিক্রিয়া
সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সরকারি কর্মচারী পরিষদের রাজ্য সভাপতি দেবাশিস শীল বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী তাঁর প্রতিশ্রুতি রেখে পুজোর আগেই ডিএ মেটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এজন্য তাঁকে ধন্যবাদ। তবে কলকাতা পুরসভার পেনশনভোগীদের ডিএ সংক্রান্ত বিষয়টিও দ্রুত বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করে আশা প্রকাশ করেন যে কর্মীদের অন্যান্য দাবিগুলিও পর্যায়ক্রমে পূরণ করা হবে।
অন্যদিকে, কো-অর্ডিনেশন কমিটির নেতা বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরী জাতীয় মূল্য সূচকের নিরিখে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী বাকি বকেয়া মেটানোর দাবি জানান। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির নেতা স্বপন মণ্ডল সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক উল্লেখ করলেও, বর্ধিত হার জুলাই মাস থেকে কার্যকর করা এবং অবশিষ্ট ২২ শতাংশ ডিএ ডিসেম্বরের মধ্যে মিটিয়ে দেওয়ার দাবি তোলেন।

