কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে ৫ ঘণ্টার পুলিশি তল্লাশি; সুমিত রায়ের খোঁজে হানা, মিলল না কিছুই

কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে ৫ ঘণ্টার পুলিশি তল্লাশি; সুমিত রায়ের খোঁজে হানা, মিলল না কিছুই

তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের পটুয়াপাড়ার বাসভবনে এক ম্যারাথন তল্লাশি অভিযান চালাল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনি থানার পুলিশ। শনিবার ভোর ৩টে নাগাদ বিশাল কেন্দ্রীয় বাহিনী সঙ্গে নিয়ে পুলিশ সেখানে পৌঁছায়। দীর্ঘক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করার পর, ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ বাড়ির বাইরের দরজার তালা ভেঙে ভিতরে ঢোকেন তদন্তকারীরা। প্রায় ৯০ মিনিট ধরে চলা এই তল্লাশিতে অবশ্য আপত্তিকর কিছু বাজেয়াপ্ত করা যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তুত করা পুলিশের বাজেয়াপ্ত তালিকায় (সিজার লিস্ট) ‘নিল’ (Nil) বা শূন্য লেখা হয়েছে। তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদ সাগরিকা ঘোষ ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে সেই নথি প্রকাশ করেছেন।

ঘটনাস্থলে মুখ্যমন্ত্রী ও অভিষেকের প্রতিক্রিয়া

শনিবার সকালে পুলিশি তল্লাশির খবর পেয়েই কালীঘাটের ওই বাড়িতে পৌঁছান তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তল্লাশি প্রক্রিয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন এবং পরে ফিরে যান।

অভিযান শেষে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তালা ভেঙে তাঁর পুরো বাড়িতে ‘সার্চ’ বা তল্লাশি চালানো হয়েছে এবং সমগ্র বিষয়টি রেকর্ড করা হয়েছে। তাঁর আপ্তসহায়ক সংক্রান্ত সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি স্পষ্ট জানান, তিনি কাউকে বাড়িতে লুকিয়ে রাখেননি এবং তদন্তকারী সংস্থাও কিছু পায়নি। বিজেপি ও বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সমালোচনা করে অভিষেক বলেন:

“সরকার পাল্টেছে এখন আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হচ্ছে। অমিত শাহের বিরুদ্ধে কেন মামলা হবে না? ধমকে চমকে, সিবিআই, সিআইডি দিয়ে তৃণমূলকে সরিয়ে দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক ভাবে লড়াই করুন। বুলডোজ়ার না নামিয়ে উন্নয়নের কাজ করুক বর্তমান সরকার।”

কেন এই তল্লাশি? জানালেন পুলিশ সুপার

পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, শালবনিতে একটি জমি জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলার তদন্তের সূত্র ধরেই এই অভিযান। তিনি বলেন, “সুজয় হাজরাকে (মেদিনীপুরের প্রাক্তন বিধায়ক তথা তৃণমূলের পরাজিত প্রার্থী) আমরা প্রথমে গ্রেফতার করি। ওঁর কাছে বেশ কিছু টাকার হদিস পাওয়া যায়। সেই টাকা দু’তিন হাত ঘুরেছে। সেই সূত্রে আমরা সুমিতের নাম পাই।”

পুলিশ সুপারের দাবি, গত দু-তিন দিন ধরে সুমিতকে ট্র্যাক করার পর শুক্রবার রাতে কালীঘাটের ওই বাড়িতে তাঁর মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন শেষবারের মতো পাওয়া যায়। সেই কারণেই শালবনি ও কালীঘাট থানার পুলিশ যৌথভাবে সেখানে হানা দেয়। তবে সেখানে সুমিতকে পাওয়া যায়নি। সকাল ৮টা নাগাদ পুলিশ সেখান থেকে চলে যায়। শুধু কলকাতায় অভিষেকের বাড়িই নয়, হুগলিতে সুমিতের নিজস্ব বাড়ি এবং শ্রীরামপুরের বিবেকানন্দ সরণিতে তাঁর শ্বশুরবাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়েছে। সুমিতের শাশুড়ি অবশ্য জানান যে, গত দু-এক দিনের মধ্যে তাঁর জামাই সেখানে আসেননি এবং তিনি তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

কে এই সুমিত রায়?

তৃণমূল সূত্রের খবর, দক্ষিণ কলকাতার নবনালন্দা স্কুলে পড়ার সময় থেকেই অভিষেকের সহপাঠী ও বাল্যবন্ধু সুমিত রায়। পরবর্তীকালে তিনি অভিষেকের আপ্তসহায়ক এবং ক্যামাক স্ট্রিটের দফতরের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে ২০১৯ এবং ২০২১ সালের নির্বাচনের পর থেকে দলের সংগঠন, আইপ্যাকের রিপোর্টের ভিত্তিতে সাংগঠনিক রদবদল এবং ডায়মন্ড হারবারের কাজকর্মে তিনি অভিষেকের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ‘চোখ ও কান’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। দলের যুব নেতারা সুমিতকে ‘ক্যাপ্টেন’ বলে অভিহিত করতেন। তৃণমূল থেকে নিলম্বিত হওয়া প্রাক্তন মুখপাত্র ঋজু দত্ত সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, “সুমিত রায় কে, সেটা তৃণমূলের সাংসদ-বিধায়কেরা খুব ভাল করে জানেন।”

যদিও তৃণমূলের একাংশ সুমিতের এই ভূমিকার বিরোধিতা করেছেন। দলের প্রবীণ নেতা কুণাল ঘোষের দাবি, সুমিত দলের কেউ নন এবং এবারের নির্বাচনে তাঁর মনোনয়ন আটকাতেও সুমিত সক্রিয় ছিলেন।

‘উপলক্ষ সুমিত, লক্ষ্য অভিষেক’: বহুমুখী তদন্তের বেড়াজাল

তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের অভিযোগ, সুমিত রায়কে কেবল উপলক্ষ্য করে মূল নিশানা করা হচ্ছে খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বর্তমানে একাধিক মামলা ও তদন্ত সংস্থার সাঁড়াশী চাপের মুখে রয়েছেন তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতা।

  • সই-কাণ্ড (সিআইডি): বিধানসভায় তৃণমূলের পরিষদীয় দলের তরফে স্পিকারকে পাঠানো চিঠিতে বিধায়কদের সইতে ‘অসঙ্গতি’র অভিযোগে সিআইডি তদন্ত চলছে। ওই চিঠিতে তৃণমূলের লোকসভা নেতা হিসেবে অভিষেকের স্বাক্ষর ছিল। গত বৃহস্পতিবার আদালতের নির্দেশে ভবানী ভবনে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অভিষেককে জেরা করে সিআইডি। এরপর শুক্রবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে আগামী রবিবার (১৪ জুন) পুনরায় হাজিরার নোটিস ধরানো হয়েছে।
  • প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতি (ইডি): এই মামলায় আগামী সোমবার (১৫ জুন) অভিষেককে তলব করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।
  • উস্কানিমূলক বক্তব্য মামলা (সাইবার সেল): বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে ‘ডিজে বাজানো’ সংক্রান্ত উস্কানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগে সল্টলেক সাইবার থানায় দায়ের হওয়া মামলায় আগামী মঙ্গলবার (১৬ জুন) ভবানী ভবনে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
  • পুরনো মামলার জটিলতা: ডায়মন্ড হারবারের বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস (যিনি ২০১৪ ও ২০২৪ সালে অভিষেকের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন) সম্প্রতি ২০১৮ সালের একটি পুরনো প্রাণঘাতী হামলার ঘটনার প্রেক্ষিতে নতুন করে এফআইআর ও বিস্তারিত তদন্তের জন্য ডায়মন্ড হারবার থানায় আবেদন জানিয়েছেন।

মমতার বাসভবনে অভিষেক-কুণাল বাগ্‌বিতণ্ডা

এই পুলিশি অভিযানের আবহেই শনিবার সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনে এক হাই-ভোল্টেজ সাংগঠনিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

সূত্র মারফত জানা গেছে, উত্তর কলকাতার জেলা সভাপতি পদে নিয়োগ এবং দ্রুত রদবদলের দাবি ঘিরে কুণাল ঘোষ ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও চোখাচুখি হয়। কুণাল বলেন, “অভিষেক তুমি আর লেবু কচলে তেতো কোরো না।” একপর্যায়ে অভিষেক সুমিত রায়ের প্রসঙ্গ টেনে কুণালকে বলেন, “তুমি আমার আর সুমিতের বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট দিয়েছো।” জবাবে কুণাল বলেন, “আমি তোমার বিরুদ্ধে কোনও স্টেটমেন্ট দিইনি। তুমি সুমিতকে কেন নিজের কাঁধে নিচ্ছো!” পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় হস্তক্ষেপ করেন। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুই নেতার মাথায় হাত রেখে পরিস্থিতি শান্ত করতে বলেন— “ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল, এখন শান্ত থাকতে হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.