ভোটের বাংলায় মেগা শনিবার: একদিকে মোদী-শাহ, অন্যদিকে মমতা-অভিষেক; এসআইআর ও আদিবাসী ইস্যুতে সম্মুখসমরে যুযুধান দু’পক্ষ

ভোটের বাংলায় মেগা শনিবার: একদিকে মোদী-শাহ, অন্যদিকে মমতা-অভিষেক; এসআইআর ও আদিবাসী ইস্যুতে সম্মুখসমরে যুযুধান দু’পক্ষ

বিধানসভা নির্বাচনের পারদ তুঙ্গে চড়িয়ে শনিবার প্রচারের ময়দানে সর্বশক্তি দিয়ে নামল তৃণমূল ও বিজেপি। একদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, অন্যদিকে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়— আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের এক টানটান লড়াই দেখল পশ্চিমবঙ্গ। শনিবার উত্তর থেকে দক্ষিণ, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দুই শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্ব মোট ১২টি জনসভা ও দু’টি বর্ণাঢ্য রোড শো সারলেন।


এসআইআর বিতর্ক: অনুপ্রবেশ বনাম হিন্দু ভোটার

এবারের নির্বাচনে অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে এসআইআর (SIR)। বাঁকুড়ার ওন্দা ও ছাতনার সভা থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হুঙ্কার দিয়ে বলেন,

“নির্বাচন কমিশন এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দিচ্ছে বলেই মমতা দিদির সমস্যা শুরু হয়েছে। বিজেপি সরকার গড়লে আমরা এই অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্য থেকে বিতাড়িত করব।”

পাল্টা বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের সভা থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, হিন্দুত্বের দোহাই দেওয়া বিজেপির আমলে এসআইআর-এর জেরে কেন প্রায় ৫৮ লক্ষ হিন্দু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ গেল? তৃণমূলের দাবি, এসআইআর-এর নামে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে।

আদিবাসী ও রাজবংশী আবেগ

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে তৃণমূলের ‘অপমান’ করার অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এদিন সুর চড়ান। কাটোয়া ও জঙ্গিপুরের সভা থেকে তিনি বলেন, “তৃণমূল কখনও আদিবাসী উন্নয়নের শরিক হয়নি, বরং তাঁরা রাষ্ট্রপতি ও আদিবাসী সমাজকে অপমান করেছে।”

পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়ারি ও ঝাড়গ্রামের সভা থেকে তিনি বলেন, “আমরা আইন করে আদিবাসীদের জমির অধিকার সুরক্ষিত করেছি। বিজেপি ক’বার আদিবাসীদের উৎসবে সামিল হয়েছে?” পাশাপাশি তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ক্ষমতায় ফিরলে আদিবাসীদের ‘সারি-সরনা’ ধর্মকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে।


অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) নিয়ে সংঘাত

পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডির সভা থেকে অমিত শাহ স্পষ্ট বার্তা দেন, উত্তরাখণ্ড বা গুজরাটের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি ক্ষমতায় এলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালু করা হবে। এর তীব্র বিরোধিতা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “ইউনিফর্ম সিভিল কোড মানে সর্বধর্মের সর্বনাশ। ভোটের সময় পেশ করা এই স্বেচ্ছাচারী বিল আমরা ক্ষমতায় এসে বাতিল করে দেব।”

নিয়োগ দুর্নীতি ও পার্থ প্রসঙ্গ

শনিবার সকালেই প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে ফের ইডি হানা দেয়। এই বিষয়টিকে অস্ত্র করে জঙ্গিপুরের সভা থেকে মোদী বলেন, “শিক্ষকের চাকরির নামে যুবসমাজকে ঠকিয়েছে তৃণমূল। মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠের বাড়িতে কোটি কোটি নগদ টাকা পাওয়া গেছে। বিজেপি এলে সব দুর্নীতির হিসাব হবে।”


এক নজরে শনিবারের প্রচারচিত্র:

  • নরেন্দ্র মোদী: কাটোয়া, জঙ্গিপুর ও কুশমণ্ডিতে জনসভা। সন্ধ্যায় শিলিগুড়িতে বিশাল রোড শো।
  • অমিত শাহ: বাঁকুড়ার ওন্দা, ছাতনা এবং পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডিতে জনসভা।
  • মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: বাঁকুড়ার বড়জোড়া, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়ারিতে সভা।
  • অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়: মুর্শিদাবাদের রেজিনগর ও বীরভূমের সাঁইথিয়ায় সভা। শেষে পূর্ব বর্ধমানের মেমারিতে বর্ণাঢ্য রোড শো।

শনিবারের এই হাই-ভোল্টেজ প্রচারের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষই এখন মেরুকরণ এবং আদিবাসী ভোটের সমীকরণ মেলাতে মরিয়া। এসআইআর এবং কর্মসংস্থান—এই দুই ইস্যুই শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.