পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের ‘বহিরাগত’ তকমার কড়া জবাব দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শুক্রবার বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশের অনুষ্ঠান থেকে শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ২০২৬-এ বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন এ রাজ্যেরই কোনো ‘ভূমিপুত্র’। একই সঙ্গে তৃণমূলের বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তুলে আক্রমণ আরও তীব্র করেছেন তিনি।
‘পরিবারবাদ’ বনাম ‘বাঙালি আবেগ’
তৃণমূল কংগ্রেস বরাবরই বিজেপিকে ‘দিল্লি-গুজরাটের পার্টি’ বলে আক্রমণ করে এসেছে। পাল্টা জবাবে অমিত শাহ এদিন সাফ জানান, বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী কোনো বংশপরম্পরায় রাজনীতি করে আসা ব্যক্তি হবেন না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না করে তিনি বলেন,
“আমরা কোনো পরিবারবাদ করি না যে একজনের পর আরেকজন ভাইপো মুখ্যমন্ত্রী হবে। বিজেপি এমন একজনকে মুখ্যমন্ত্রী করবে যিনি বাংলার বাসিন্দা এবং ঘোরতর বাঙালি।”
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বাংলার মেয়ে’ স্লোগানের বিপরীতে ‘বাঙালির আবেগকে’ মর্যাদা দেওয়া এবং তৃণমূলের ‘পরিবারবাদ’-কে নিশানা করা—এই দ্বিমুখী রণকৌশল নিয়েই বঙ্গ জয়ের ছক কষছে দিল্লি।
কে হবেন বিজেপির ‘মুখ’? ঘনীভূত জল্পনা
অমিত শাহ এদিন কোনো নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ না করলেও তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হবেন একজন “অত্যন্ত শক্তিশালী নেতা এবং দক্ষ সংগঠক”। শাহের এই বার্তার পর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—তবে কি বকলমে শুভেন্দু অধিকারীই বিজেপির মুখ?
সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার হাইপ্রোফাইল কেন্দ্রের প্রচারে শুভেন্দুকে সামনে রেখে কর্মীদের স্লোগান সেই জল্পনাকে উসকে দিয়েছিল। তবে দলের একটি অংশ এখনই কোনো একক মুখ মানতে নারাজ।
দিলীপ-শুভেন্দুর অবস্থান ও দলীয় সমীকরণ
মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী প্রসঙ্গে বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা খড়্গপুর সদরের প্রার্থী দিলীপ ঘোষ নিজের চিরাচরিত মেজাজে বলেন,
- “দলের পদ্ধতি অনুযায়ী আগে থেকে নাম ঘোষণা হয় না। অনেক সময় এমন কেউ মুখ্যমন্ত্রী হন, যাঁর মুখ আগে থেকে কেউ চেনে না। ভোটের পরই সব ঠিক হবে।”
অন্যদিকে, শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্তের ভার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অমিত শাহের এদিনের মন্তব্য আসলে দলের ভেতরের অন্তর্দ্বন্দ্ব ধামাচাপা দেওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের ‘বহিরাগত’ প্রচারের ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
এক নজরে শাহের বার্তার তাৎপর্য:
- তৃণমূলের পাল্টা: ‘বহিরাগত’ তকমা মুছতে ভূমিপুত্রের কার্ড খেলা।
- পরিবারতন্ত্রে আঘাত: ভাইপো-কেন্দ্রিক রাজনীতির সমালোচনা করে সাধারণ বাঙালির কাছে পৌঁছানো।
- নেতৃত্বের ইঙ্গিত: দক্ষ সংগঠক ও শক্তিশালী নেতার কথা বলে কর্মীদের চাঙ্গা করা।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর লড়াইয়ে বিজেপি যে কেবল ভাতা বা ইস্তাহারের প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না, বরং এক হেভিওয়েট ভূমিপুত্রকে সামনে রেখে ময়দানে নামতে চাইছে, তা আজ শাহের মন্তব্যে পরিষ্কার হয়ে গেল।

