বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক নজিরবিহীন ও আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছেন দর্শকরা। অকালপ্রয়াত প্রতিভাবান অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁর অভিনীত শেষ ছবি ‘ছবিওয়ালা’ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নির্মাতারা। এই উদ্যোগের পেছনে কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য বা ব্যক্তিগত প্রচার নেই; বরং এটি এক সহকর্মীর প্রতি নির্মাতাদের নিখাদ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
বদলে গেল নাম, লক্ষ্য এখন শুধুই শ্রদ্ধার্ঘ্য
ছবিটির কাজ যখন শুরু হয়েছিল, তখন এর নাম রাখা হয়েছিল ‘নেগেটিভ’। কিন্তু রাহুলের আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রয়াণ পুরো নির্মাতা দলকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। গল্পের চেয়েও জীবনের ট্র্যাজেডি যেন বড় হয়ে ওঠে। সেই শোকাতুর মুহূর্ত থেকেই ছবির নাম বদলে রাখা হয় ‘ছবিওয়ালা’। নির্মাতাদের মতে, এই ছবিটি শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং এক শিল্পীর জীবন, নীরব সংগ্রাম এবং অপ্রাপ্তির প্রতিচ্ছবি।
পর্দার কাহিনি ও বাস্তবের এক অদ্ভুত সমাপতন
‘ছবিওয়ালা’ ছবির মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে এমন এক শিল্পীকে নিয়ে, যিনি জীবদ্দশায় যোগ্য সম্মান না পেলেও মৃত্যুর পর তাঁর কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়। সিনেমার শেষ দৃশ্যে কেন্দ্রীয় চরিত্রটির আত্মত্যাগের মুহূর্ত—জলে ডুবে মৃত্যু—বাস্তবে রাহুলের অপমৃত্যুর সঙ্গে এক অদ্ভুত ও মর্মান্তিক মিল তৈরি করেছে। এই সমাপতন পুরো শ্যুটিং টিমকে আরও বেশি আবেগপ্রবণ করে তুলেছে।
নেপথ্যের কারিগর ও কলাকুশলী
পরিচালক বাপ্পার পরিচালনায় এবং শান্তনু নাথের গল্প ও চিত্রনাট্যে ছবিটি নিবেদিত হয়েছে ম্যাচস্টিক মোশন পিক্চার্স ও A4J ফিল্মসের পক্ষ থেকে। ছবিতে রাহুলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন:
- দেবলীনা দত্ত
- শ্রীলেখা মিত্র (বিশেষ উপস্থিতি)
- শান্তনু নাথ, রানা বসু ঠাকুর, রিমি দেব ও অন্যান্যরা।
ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন সৌম্যঋত। রূপম ইসলামের কণ্ঠে একটি বিশেষ গান রাহুলকে শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়াও কণ্ঠ দিয়েছেন সোমলতা আচার্য্য এবং জোজো মুখার্জি।
বিনামূল্যে মুক্তি ও নির্মাতাদের আবেদন
সীমিত বাজেট ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তৈরি হওয়া এই ছবিটি নিয়ে কোনো ব্যবসায়িক মুনাফা করতে নারাজ প্রযোজক ও পরিচালক। তাঁরা প্রেক্ষাগৃহে বিনামূল্যে ছবিটি দেখানোর পরিকল্পনা করেছেন এবং হল মালিকদের কাছে এই মহত উদ্দেশ্যে সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছেন।
পরিচালক বাপ্পার স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে রাহুলের উদারতার কথা। তিনি জানান, তাঁর প্রথম ছবি ‘শহরের উপকথা’-র সময় রাহুলই তাঁকে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠা পেতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। নতুন শিল্পীদের প্রতি তাঁর সেই অগাধ বিশ্বাসই ছিল অনেকের পথচলার শক্তি।
‘জি ২৪ ঘণ্টা’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাহুলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে টলিপাড়ায় বর্তমানে যে অস্থিরতা এবং কর্মবিরতি চলছে, তার মাঝেই ‘ছবিওয়ালা’ হয়ে উঠতে পারে এক শিল্পীর অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং তাঁর চিরন্তন সত্তার প্রতিচ্ছবি। নির্মাতারা আশা করছেন, দর্শক এই ছবির সঙ্গে আবেগের স্তরে যুক্ত হবেন এবং রাহুলের শেষ কাজকে সাদরে গ্রহণ করবেন।

