বাড়ি বিক্রি থেকে কারাবাস: লখনউয়ের ত্রাতা মুকুল চৌধরির সাফল্যের নেপথ্যে বাবার চরম আত্মত্যাগের কাহিনী

বাড়ি বিক্রি থেকে কারাবাস: লখনউয়ের ত্রাতা মুকুল চৌধরির সাফল্যের নেপথ্যে বাবার চরম আত্মত্যাগের কাহিনী

গত বৃহস্পতিবার ইডেন গার্ডেন্সে লখনউয়ের হয়ে বিধ্বংসী ইনিংস খেলে রাতারাতি ক্রিকেট বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন মুকুল চৌধরি। রাজস্থানের এক অখ্যাত গ্রাম থেকে উঠে আসা এই তরুণ তুর্কি যেভাবে বিশ্বের তাবড় বোলারদের শাসন করেছেন, তা দেখে মুগ্ধ ক্রিকেটপ্রেমীরা। তবে এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে তাঁর বাবা দলীপ চৌধরির দীর্ঘ লড়াই, দারিদ্র্য আর চরম ত্যাগের এক অসামান্য উপাখ্যান।


ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে সর্বস্বান্ত বাবা

রাজস্থানের ঝুনঝুনু জেলার খেদারো কি ধানি গ্রামের বাসিন্দা দলীপ চৌধরি। ২০০৪ সালে মুকুলের জন্মের পরেই তিনি স্থির করেছিলেন ছেলেকে ক্রিকেটার বানাবেন। ২০১৬ সালে বাড়ি থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে সিকারে একটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ছেলেকে ভর্তি করেন তিনি। কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে ছেলের প্রশিক্ষণের খরচ জোগানো অসম্ভব হয়ে পড়লে দলীপ তাঁর একমাত্র সম্বল নিজের বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। বিক্রি করা বাড়ির ২১ লক্ষ টাকার সবটাই তিনি ছেলের ভবিষ্যতের জন্য ব্যয় করেন।

কারাবাস ও আত্মীয়দের বিদ্রুপ

পরবর্তীতে একটি হোটেল ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ নেন দলীপ। কিন্তু ব্যবসার মন্দা ও ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পারায় তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছিল। সেই কঠিন সময়ে আত্মীয়-স্বজনরা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। দলীপের কথায়,

“আত্মীয়েরা আমাকে পাগল বলত। ওরা বলত, আমি নিজের জীবন শেষ করেছি, এবার যেন ছেলেকে রেহাই দিই। কিন্তু তাঁদের এই কটু কথা আমাদের আরও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছিল।”


ধোনির ভক্ত থেকে লখনউয়ের কোটিপতি তারকা

দলীপ নিজে সচিন তেন্ডুলকর ও কপিল দেবের ভক্ত হলেও, ২০১১ বিশ্বকাপে মহেন্দ্র সিং ধোনির সেই ঐতিহাসিক ছক্কা দেখে মুকুল ধোনির অন্ধ ভক্ত হয়ে যান। বাবার কাছে উইকেটকিপিং গ্লাভস চেয়ে নিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন যাত্রা। চলতি আইপিএল নিলামে লখনউ তাঁকে ২.৬০ কোটি টাকায় দলে নেয়। মুকুল প্রথমেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এই টাকায় বাবার সমস্ত ঋণ শোধ করবেন।

ইডেনের সেই ইনিংস ও আস্থার প্রতিদান

ইডেনের বড় ইনিংসের আগে মুকুল কিছুটা মানসিক চাপে ছিলেন। দলকে জেতাতে পারছেন না বলে বাবার কাছে আক্ষেপও করেছিলেন। দলীপ জানান, “ছেলে বলত, লখনউ আমাকে এত টাকা দিয়ে কিনেছে, অথচ আমি যদি দলকে জেতাতে না পারি তবে কী লাভ? ও কথা দিয়েছিল পরের ম্যাচে ও দলকে জেতাবেই। ইডেনে ও সেই কথা রেখেছে।”

মুকুুল চৌধরির এই লড়াই কেবল ২২ গজের লড়াই নয়; এটি এক বাবার স্বপ্নপূরণের জন্য সমাজ ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জয়। আজ লখনউ তথা গোটা ক্রিকেট বিশ্ব এই তরুণ প্রতিভাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত, আর পর্দার আড়ালে এক আত্মতৃপ্তির হাসি হাসছেন তাঁর বাবা দলীপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.