দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আমেরিকা-ইরান শান্তি বৈঠক ঘিরে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের আলোচনায় বসার কথা থাকলেও শুরুর আগেই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং বিদেশে বাজেয়াপ্ত হওয়া ইরানি সম্পদ মুক্তি না দিলে কোনোভাবেই আলোচনায় অংশ নেবে না তারা। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার সদিচ্ছা না থাকলে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন।
ইরানের কঠিন শর্ত
শুক্রবার সন্ধ্যায় ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফ এক বার্তায় তেহরানের অনড় অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, “পারস্পরিক সম্মতির দুটি প্রধান শর্ত—লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের বাজেয়াপ্ত সম্পদ ফেরত দেওয়া—এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।” এই শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। একই সুর শোনা গেছে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির কণ্ঠেও। তিনি দাবি করেন, আমেরিকাকে অবশ্যই প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে এবং লেবাননের ওপর ইজরায়েলি আগ্রাসন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
ওয়াশিংটনের বার্তা ও ট্রাম্পের মেজাজ
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স ইতিবাচক আলোচনার আশা নিয়ে ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। তবে বিমানে ওঠার আগে তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন,
“আমরা আলোচনার জন্য উন্মুখ। কিন্তু ইরান যদি সদিচ্ছার পরিবর্তে আমাদের সঙ্গে কোনো চাতুরি করতে চায়, তবে তার ফল ভালো হবে না।”
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইসলামাবাদের আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ‘তোলাবাজি’ ছাড়া ইরানের হাতে আর কোনো পথ নেই। তাঁর মতে, ইরান আজও টিঁকে আছে শুধুমাত্র আলোচনার সুযোগের কারণেই।
আলোচনার টেবিলে হরমুজ প্রণালী ও লেবানন ইস্যু
কূটনৈতিক মহলের মতে, বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে চলেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের খনিজ তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সম্প্রতি ইরান এই জলপথ প্রায় বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ইরান প্রতিদিন মাত্র ১৫টি জাহাজ চলাচলের শর্তে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে, তবে তার জন্য নির্দিষ্ট শুল্ক দাবি করেছে তারা—যাকে ট্রাম্প ‘তোলাবাজি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
পাশাপাশি লেবানন পরিস্থিতি আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আমেরিকা যুদ্ধবিরতির পক্ষে থাকলেও ইজরায়েল হামলা অব্যাহত রেখেছে, যা ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে।
দুর্ভেদ্য নিরাপত্তায় ইসলামাবাদ
মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান এই বৈঠক ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। গোটা ইসলামাবাদ এখন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল সেনাবাহিনী।
বিশ্ববাসীর নজর এখন ইসলামাবাদের দিকে। এই বৈঠক কি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নতুন পথ দেখাবে, নাকি ব্যর্থ হয়ে যুদ্ধের দামামা বাজাবে—তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

