ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে (CEC) পদ থেকে সরানোর জন্য সংসদের উভয় কক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা পড়ল। বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ আচরণের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন বিরোধী সাংসদেরা। তৃণমূল কংগ্রেস ও ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের শরিকদের পাশাপাশি আম আদমি পার্টি (AAP) এবং বেশ কিছু নির্দল সাংসদও এই অপসারণের দাবিতে সই করেছেন।
১৩০ ও ৬৩: সংখ্যার লড়াই
তৃণমূল কংগ্রেস ও সংসদীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়ে এবং তাঁকে অপসারণের দাবি তুলে লোকসভা ও রাজ্যসভায় পৃথক নোটিস জমা দেওয়া হয়েছে।
- লোকসভা: ১৩০ জন সাংসদের স্বাক্ষর সংবলিত প্রস্তাব জমা পড়েছে।
- রাজ্যসভা: ৬৩ জন সাংসদ এই নোটিসে সই করেছেন। সংবাদসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, বিরোধীদের এই মেগা জোটে শুধু বড় রাজনৈতিক দলগুলোই নয়, নির্দল সাংসদদের যোগদান কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়াল।
গুরুতর অভিযোগ: পক্ষপাতিত্ব ও নির্বাচনী অনিয়ম
বিরোধীদের পক্ষ থেকে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে:
- পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ: অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি দায়িত্ব পালনকালে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের (বিজেপি) স্বার্থ রক্ষা করছেন।
- নির্বাচনী জালিয়াতিতে বাধা: জালিয়াতি সংক্রান্ত তদন্তে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
- ভোটাধিকার হরণ: পশ্চিমবঙ্গসহ অবিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার দায় তাঁর ওপর চাপানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রাখা নিয়ে তৃণমূলের নিশানায় রয়েছেন জ্ঞানেশ। এই ইস্যুতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় পাঁচ দিনের ধর্নাও দিয়েছিলেন।
অপসারণের আইনি পদ্ধতি
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। এটি অনেকটা সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টের বিচারপতির অপসারণ বা ‘ইমপিচমেন্ট’ (Impeachment) পদ্ধতির মতো।
ধাপগুলো হলো: ১. অসদাচরণ বা অক্ষমতা প্রমাণ: উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ সহ অভিযোগ আনতে হয়। ২. সংসদে প্রস্তাব পেশ: লোকসভা ও রাজ্যসভায় প্রস্তাবটি পেশ করতে হয় (যা শুক্রবার বিরোধীরা করেছেন)। ৩. বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা: দুই কক্ষেই মোট সদস্য সংখ্যার অর্ধেকের বেশি এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাবটি পাস হতে হয়।
পরবর্তী পদক্ষেপ
সংসদের দুই কক্ষে প্রস্তাব জমা পড়ার পর এখন বল স্পিকার ও চেয়ারম্যানের কোর্টে। যদি এই প্রস্তাব গৃহীত হয়, তবে ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে এটি হবে এক অত্যন্ত বিরল ঘটনা। বিজেপি বিরোধী এই ঐক্যের ফলে আগামী দিনে সংসদের অধিবেশন যে বেশ উত্তপ্ত হতে চলেছে, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

