মহার্ঘভাতা (ডিএ) নিয়ে রাজ্য ও সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ জানাল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মহার্ঘভাতা কোনো প্রশাসনিক দয়া বা অনুগ্রহ নয়, বরং এটি সরকারি কর্মচারীদের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ‘আইনি অধিকার’।
বৃহস্পতিবার শুনানির সময় আদালত ১৩টি মূল প্রশ্নের প্রেক্ষিতে রাজ্যের যুক্তি খারিজ করে কর্মচারীদের প্রাপ্য অধিকারের সপক্ষে রায় দেয়। আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ রাজ্য সরকারকে অবিলম্বে মেটাতে হবে।
আইনি অধিকার ও সাংবিধানিক সুরক্ষা
শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, রাজ্য সরকার ‘রোপা রুল ২০০৯’ (ROPA 2009) মেনে নিয়েছে। একবার কোনো নিয়ম কার্যকর হলে রাজ্য তা পালনে বাধ্য। ডিএ কর্মচারীদের পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত এবং মুদ্রাস্ফীতির বাজারে বেতনের প্রকৃত মূল্য বজায় রাখার মাধ্যম। আদালত আরও মনে করিয়ে দেয় যে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের জীবনধারণের অধিকার রয়েছে। বেতন যদি জীবনযাত্রার নুন্যতম প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে তা অর্থহীন হয়ে পড়ে।
রাজ্যের আর্থিক সংকটের যুক্তি খারিজ
শুনানি চলাকালীন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সীমাবদ্ধতার যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তা খারিজ করে দিয়েছে আদালত। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ:
- আর্থিক স্বায়ত্তশাসন বনাম অধিকার: বাজেট তৈরির স্বাধীনতা মানে কর্মচারীদের আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়।
- অজুহাত অচল: অর্থাভাবের কারণ দেখিয়ে আইনি অধিকার খর্ব করা যায় না। এমনটা হলে নাগরিকদের খাদ্য বা পানীয় জলের মতো মৌলিক অধিকারগুলোও বিপন্ন হতে পারে।
- হস্তক্ষেপের অধিকার: সাধারণত আদালত আর্থিক নীতিতে হস্তক্ষেপ না করলেও, কোনো সরকারি নীতি যদি খামখেয়ালি বা বৈষম্যমূলক হয়, তবে বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ বাধ্যতামূলক।
বকেয়া মেটানোর নির্দেশ ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা
আদালত জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার আগে নিয়মিত এআইসিপিআই (AICPI) মেনে বছরে দু’বার ডিএ প্রদান করত। এই ধারাবাহিকতার কারণেই কর্মীদের মনে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, যা হঠাৎ করে বন্ধ করা যায় না।
রায়ের মূল বিষয়সমূহ: | ক্ষেত্র | আদালতের পর্যবেক্ষণ | | :— | :— | | বকেয়া ডিএ | ২০০৯-২০১৯ এর বকেয়ার ২৫% অবিলম্বে মেটাতে হবে। | | অবশিষ্ট ৭৫% | বাকি টাকা মেটানোর জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছে আদালত। | | ডিএ-র প্রকৃতি | এটি একটি ‘রেকারিং কল’; অর্থাৎ প্রতি মাসে নতুন অধিকার তৈরি হয়। ফলে পুরনো দাবি বলে তা খারিজ করা যাবে না। |
উল্লেখ্য, এই রায়টি শুধুমাত্র ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের বকেয়া সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ডিএ-র যে ব্যবধান রয়েছে, তার ওপর এই রায়ের সরাসরি প্রভাব নেই। তবে ডিএ-কে ‘আইনি অধিকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া রাজ্য সরকারি কর্মীদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে একটি বড় নৈতিক ও আইনি জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

