অবশেষে দীর্ঘ ২১ মাসের অস্থিরতা ও এক বছরের রাষ্ট্রপতি শাসনের বেড়াজাল মুক্ত হলো মণিপুর। বুধবার রাজ্যপাল অজয়কুমার ভাল্লার উপস্থিতিতে নতুন সরকার গঠন করল ভারতীয় জনতা পার্টি। মেইতেই জনগোষ্ঠীর প্রভাবশালী নেতা ইয়ুমনান খেমচাঁদ সিংহ রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। অশান্ত মণিপুরে শান্তি ফেরাতে এবার মন্ত্রিসভায় রাখা হয়েছে সব পক্ষের প্রতিনিধিত্ব।
ত্রি-স্তরীয় মন্ত্রিসভা: মেইতেই, কুকি ও নাগাদের সমন্বয়
মণিপুরের সাম্প্রতিক গোষ্ঠীহিংসার ক্ষত মুছতে বিজেপি এক বিশেষ কৌশল নিয়েছে। খেমচাঁদের পাশাপাশি উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন দুজন:
- নেমচা কিপগেন: কুকি নেত্রী তথা বিজেপি বিধায়ক। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হুমকি উপেক্ষা করেই তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন।
- এল দিখো: নাগা পিপলস ফ্রন্ট (NPF) তথা বিজেপির সহযোগী দলের বিধায়ক।
কে এই ইয়ুমনান খেমচাঁদ?
৬২ বছর বয়সী খেমচাঁদ সিংজামেই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে দুবারের জয়ী বিধায়ক। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বৈচিত্র্যময়:
- ক্রীড়াবিদ থেকে রাজনীতি: তিনি তাইকোন্ডোর পঞ্চম ডান ব্ল্যাক বেল্ট অধিকারী।
- রাজনৈতিক পথ: ২০০২ সালে ডেমোক্র্যাটিক রেভলিউশনারি পিপলস পার্টি দিয়ে যাত্রা শুরু। পরে কংগ্রেস ও তৃণমূল ঘুরে ২০১৩ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। তিনি মণিপুর বিধানসভার প্রাক্তন স্পিকারও ছিলেন।
- ব্যক্তিত্ব: বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহের তুলনায় খেমচাঁদ অনেকটা ‘নরমপন্থী’ হিসেবে পরিচিত। বিগত আড়াই বছরের সংঘাতের মাঝে তিনিই ছিলেন একমাত্র মেইতেই নেতা, যিনি কুকি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
কেন এই পরিবর্তন? এক নজরে প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালের মে মাস থেকে মণিপুরে মেইতেই ও কুকি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু হয়। তফশিলি জনজাতির মর্যাদা সংক্রান্ত হাইকোর্টের একটি নির্দেশকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া এই হিংসায় প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ঘরছাড়া হয়েছেন ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ। পরিস্থিতির চাপে ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংহ পদত্যাগ করেন এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। দীর্ঘ এক বছর পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে এল রাজ্যটি।
আগামীর চ্যালেঞ্জ
গত লোকসভা নির্বাচনে মণিপুরের দুটি আসনেই জয়লাভ করেছে কংগ্রেস। এই অবস্থায় বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি পুনরুদ্ধার করা খেমচাঁদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে কুকি ও নাগা প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে গঠিত এই নতুন মন্ত্রিসভা রাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরাতে পারবে বলে আশা করছে রাজনৈতিক মহল।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ জানান, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হবে বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের সেতুবন্ধন করা এবং ঘরছাড়াদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

