বাংলার আকাশে-বাতাসে আজ এক অদ্ভুত গুমোট ভাব। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “আমরা সবাই রাজা”, কিন্তু আজকের বাংলায় সেই গান যেন এক করুণ পরিহাস। রুদ্রনীল ঘোষের কবিতার ভাষায় বলতে হয়, এ রাজ্যে “রাজার কথাই শেষ কথা”, আর আমরা সাধারণ মানুষরা যেন সেই রাজার দাবার বোড়ে। সংবিধান আজ ধুলোয় লুটোপুটি খায়, আর “ভীনদেশী” অনুপ্রবেশকারীরা রাজার প্রশ্রয়ে আমাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ভাগ বসায়। কিন্তু মা-বোনেরা, হতাশার এই অন্ধকারের শেষ প্রান্তে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন কেবল সরকার বদল নয়, এ এক হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের সলতে পাকানোর কাজটা নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে শুরু করে দিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি।
দুর্গাপুর থেকে উত্তরের পাহাড়: রণকৌশলে শান
শাসক দল যখন চোর-পুলিশ খেলায় ব্যস্ত, বিজেপি তখন ঘর গোছাতে মন দিয়েছে। সম্প্রতি দুর্গাপুরে বিজেপির কোর কমিটির বৈঠকে আমরা এক অন্য বিজেপিকে দেখলাম। নবাগত রাজ্য প্রভারী নীতিন নবীন স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন, হাওয়ায় ভেসে রাজনীতি হয় না। সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষদের নিয়ে তিনি যে ম্যারাথন বৈঠক করলেন, তা কেবল চা-চক্র ছিল না। সেখানে উঠে এসেছে বুথ কমিটিকে শক্তিশালী করার ডাক, প্রার্থী বাছাইয়ের কড়া মাপকাঠি। নীতিন নবীনের এই “পাঠশালা” বুঝিয়ে দিচ্ছে, বিজেপি আর আবেগের ওপর ভর করে নেই, তারা এবার সংগঠনের শিকড় মজবুত করছে।
তৃণমূল নেতারা কটাক্ষ করে বলেন, বিজেপির নেতারা নাকি “ভোট পাখি” বা ডেইলি প্যাসেঞ্জার। কিন্তু তারা ভুলে যান, চাণক্য যখন যুদ্ধজয়ের ছক কষেন, তখন তিনি বারবার সেই মাটিতেই ফিরে আসেন। অমিত শাহজি আগামী ৩১ জানুয়ারি ফের বাংলায় আসছেন। এবার কোনো জনসভা নয়, তিনি নিচ্ছেন “পার্টি ক্লাস”। উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং-এর কর্মীদের নিয়ে তিনি যে সাংগঠনিক বৈঠক করবেন, তা ২০২৬-এর বিজয়ের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করার লক্ষ্যেই। শাসক দলের পায়ের তলার মাটি যে সরছে, তা তারা অমিত শাহের এই ঘন ঘন আনাগোনা আর কর্মীদের এই প্রশিক্ষণ দেখেই বুঝতে পারছে।
বেনিয়মের রাজত্ব বনাম সুশাসনের অঙ্গীকার
আজ বাংলার মায়েদের ঘুম নেই। কেন? কারণ রুদ্রনীলের সেই অমোঘ সত্য—”বেনিয়মে ভিনদেশী রোজ ঢোকে সেই রাজারই দেশে / ভুয়া পাসপোর্ট ভুয়া আধার দিচ্ছে রাজাই নিজে ঠুসে।” এই যে অনুপ্রবেশের সমস্যা, এই যে আমাদের ছেলেমেয়েদের চাকরির ফাইল চুরি হয়ে যাওয়া—এর শেষ কোথায়? শাসক দলের নেতারা যখন সিন্ডিকেট আর কাটমানিতে মগ্ন, তখন সাধারণ প্রজার ভাতের থালায় টান পড়ছে। আবাসের টাকা চুরি করে প্রাসাদে থাকা সেই “রাজা”দের দিন কি ঘনিয়ে আসেনি?
বিজেপি এই অরাজকতার বিরুদ্ধে একমাত্র বিকল্প। বর্ধমান, আসানসোল, রানীগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলকে বিজেপি তাদের পাখির চোখ করেছে। কেন জানেন? কারণ আরএসএস এবং বিজেপির কর্মীরা সেখানে নীরবে মাটি তৈরি করেছেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর বাংলায় হিন্দু অস্তিত্ব রক্ষা এবং উন্নয়নের স্বার্থে এই অঞ্চলগুলো ২০২৬-এ গেমচেঞ্জার হতে চলেছে।
প্রশাসনের মেরুদণ্ড ও আসন্ন বদল
শাসক দলের অনুগত কিছু পুলিশ আধিকারিক এতদিন যে দাপট দেখিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের কড়া নির্দেশে সেই দিনও ফুরিয়ে আসছে। কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিক প্রভুদের খুশি করতে গিয়ে নিয়ম ভাঙলে রেয়াত করা হবে না। প্রশাসনের অন্দরেও আজ পরিবর্তনের হাওয়া। মানুষ বুঝেছে, যে “রাজা” প্রজার অধিকার কেড়ে নিয়ে কেবল নিজের আখের গোছায়, সেই রাজতন্ত্রকে উপড়ে ফেলার সময় এসেছে।
২০২৬-এ আমাদের লক্ষ্য স্থির। একদিকে দুর্নীতি, তোষণ আর অপশাসনের “রাজার রাজত্ব”, আর অন্যদিকে মোদীজির নেতৃত্বে সুশাসন ও আত্মমর্যাদার বাংলা। নীতিন নবীন থেকে অমিত শাহ—বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব যখন বাংলার মাটি কামড়ে পড়ে আছেন, তখন আমাদেরও দায়িত্ব তাদের হাত শক্ত করা। আসুন, আমরা শপথ নিই, এই অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে এক সত্যিকারের প্রজাতন্ত্র গড়ে তুলব, যেখানে প্রজারাই হবে আসল রাজা। পদ্ম ফুলেই হোক আগামী ভোরের সূচনা।

