বরাহনগরে আইএসআই ক্যাম্পাস জুড়ে তরতাজা বৃক্ষের নিধনযজ্ঞ! তোলপাড় হতেই থামল ‘কাজ’, কিন্তু প্রশ্ন: শেষরক্ষা হবে তো?

কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট’ (আইএসআই) ক্যাম্পাসে গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে শোরগোল। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তোলেন খোদ ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, কর্মী এবং আধিকারিকদের একাংশ। বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা হতেই আপাতত গাছ কাটা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিকর্তা (ডিরেক্টর) অয়নেন্দ্রনাথ বসু। সরকারি তদারকির পর গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তাঁর মনেও এ বিষয়ে সংশয় রয়েছে।

৯৪ বছরের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইএসআই-এর প্রধান ক্যাম্পাস কলকাতায়। বরাহনগরে, বিটি রোডের ধারে। জানা গিয়েছে, ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ডিরেক্টরের নির্দেশে গাছ কাটা শুরু হয়। কর্তৃপক্ষের একাংশের দাবি, গাছ কাটার অনুমতি চেয়ে রাজ্যের বন দফতরের কাছে আবেদন করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতেই ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেন বনকর্মীরা। দাবি, তাঁরাই নাকি ক্যাম্পাসের অনেকগুলি গাছ কাটা যাবে বলে জানিয়ে যান। তেমনই ৬৫টি গাছ চিহ্নিত করা হয়। অনেক গাছই নাকি ‘মৃত’! আইএসআই-এর গাছ কাটার বিষয়ে রাজ্যের বনমন্ত্রী বিরবাহা হাঁসদার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এটি তাঁর গোচরে নেই।

গত ডিসেম্বরে বন দফতরের ছাড়পত্র পাওয়ার পরেই গাছ কাটার কাজ শুরু হয়। বেশ কয়েকটি গাছ কেটেও ফেলা হয়েছে ইতিমধ্যে। কিন্তু যে গাছগুলো কাটা হচ্ছে বা ভবিষ্যতে কাটার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলি আদৌ মৃত তো? প্রশ্ন তোলেন বিক্ষুব্ধ অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, কর্মী এবং আধিকারিকেরা। গাছ কাটার প্রতিবাদ জানান তাঁরা। বছর ঘুরতে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর বদল হয়। তার পরেই তাঁর কাছে এই বিষয়টি নিয়ে দরবার করেন বিক্ষুব্ধরা। তাঁরা চিঠি দেন অয়নেন্দ্রনাথকে। চিঠিতে বেশ কয়েকটি দাবি তোলেন তাঁরা।

আইএসআই ক্যাম্পাসে পড়ে রয়েছে কাটা গাছ।

বন দফতরের নথিতে যে ৬৫টি গাছ কাটার কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে ১২টি মৃত বলে উল্লেখ রয়েছে। বাকিগুলো ‘জীবিত এবং সতেজ’ বলে লেখা রয়েছে নথিতে। এক সঙ্গে এতগুলো গাছ কাটা নিয়ে আপত্তি তোলেন অধ্যাপকেরা। এ বিষয়ে অয়নেন্দ্রনাথ বলেন, “আমিও আপত্তি করছি। তবে আমি সবে এসেছি। গাছ কাটার বিষয় জানার পরই পরিদর্শনে যাই। ঘুরে দেখেছি গাছগুলি। কিছু গাছ কাটা হয়েছে। কিছু গাছের গায়ে চিহ্ন করা রয়েছে, তা-ও দেখেছি। তবে সেগুলি কাটার জন্য কি না, তা খোঁজখবর নিয়ে দেখছি।’’ গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তা আদৌ রয়েছে কি না, সে বিষয়েও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান অয়নেন্দ্রনাথ। নয়া ডিরেক্টর কথায়, ‘‘কেন গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেই সব নথি দেখা হচ্ছে।’’

প্রতিবাদীরা যে চিঠি দিয়েছেন ডিরেক্টরকে, সেখানে উল্লেখ করা হয়, গাছ কাটা হচ্ছে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক আধিকারিক (সিইও, অর্থ) রবীন্দ্র কুমার এবং এস্টেট অফিসের ইনচার্জের নির্দেশে। অনেক তরতাজা গাছ কাটা হয়েছে। এই ঘটনা নিয়ে তদন্ত না-হওয়া পর্যন্ত ওই দুই আধিকারিককে সাসপেন্ড (নিলম্বিত) করার দাবিও জানান তাঁরা। সে প্রসঙ্গে আইএসআই-এর ডিরেক্টর বলেন, ‘‘বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।’’

যাঁর আমলে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রাক্তন ডিরেক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। পরে রবীন্দ্রকে ফোন করলে তিনি আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেন, ‘‘বিষয়টি নিয়ে বেশি বিতর্ক করা হচ্ছে। গাছ কাটা যা হচ্ছে তা বনদফতরের অনুমতিক্রমে।’’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তরফে যে আবেদন করা হয়েছিল, সে ব্যাপারে প্রথমে কিছু না-বললেও পরে স্বীকার করেন। তবে গাছ কাটা যে ‘যুক্তিসঙ্গত’ তা বার বার বুঝিয়ে দেন। রবীন্দ্রর দাবি, ক্যাম্পাসের পাঁচিল লাগোয়া অনেক গাছ রয়েছে। কিছু গাছ বিটি রো়ডের উপর ঝুলেও পড়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘এটা সাইক্লোনপ্রবণ জায়গা। ঝড়বৃষ্টি হয়। তার ফলে যদি ক্যাম্পাসের কোনও গাছ ভেঙে পড়ে কারও ঘরবাড়ি ভাঙে বা কোনও অঘটন ঘটে, তবে তার দায় কে নেবে?’’ তিনি এ-ও দাবি করেন, শুধু গাছ কাটা হয়নি, তার পরিবর্তে নিয়ম মেনে গাছ লাগানোও হয়েছে। যে কয়েকটা গাছ কাটা হয়েছে, তা বদলে এখনও পর্যন্ত ১৫০টি গাছ লাগিয়েছেন তাঁরা। রবীন্দ্রর দাবি, গাছ কাটা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।

আইএসআই ক্যাম্পাসে পড়ে রয়েছে কাটা গাছ।

রবীন্দ্রর যুক্তি মানতে নারাজ ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দু’দশকের বেশি সময় ধরে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত এক অধ্যাপক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অধ্যাপকের দাবি, ‘‘এত বছর আমি এখানে আছি। কখনও শুনিনি বা দেখিনি গাছ পড়ে কারও ঘরবাড়ি ভেঙেছে বা মৃত্যু হয়েছে।’’ আরও এক অধ্যাপকের কথায়, ‘‘গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তা দেখা হোক। যদি তেমন কারণ না-থাকে তবে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি আমরা।’’ আইএসআই-এর গাছ কাটা প্রসঙ্গে রাজ্যের বনমন্ত্রী বলেন, ‘‘কী হয়েছে, তা সম্পূর্ণ জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।’’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.