হরমোজ প্রণালীতে রণংদেহি মেজাজ: ভারতগামী থাই জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, উত্তপ্ত আরব সাগর

হরমোজ প্রণালীতে রণংদেহি মেজাজ: ভারতগামী থাই জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, উত্তপ্ত আরব সাগর

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকালীন উত্তেজনা এবার আছড়ে পড়ল ভারতের দোরগোড়ায়। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) বুধবার এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হলো ভারতগামী থাইল্যান্ডের পণ্যবাহী জাহাজ ‘ময়ূরী নারী’ (Mayuree Naree)। গুজরাটের মুন্ড্রা বন্দরের অভিমুখে রওনা দেওয়া এই বিশাল জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জি নিউজ (Zee News) ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, মাঝ সমুদ্রে চলা এই তাণ্ডবের মাঝে ২০ জন নাবিককে উদ্ধার করা গেলেও এখনও নিখোঁজ ৩ জন।


হামলার বিবরণ: মাঝ সমুদ্রে অতর্কিত আঘাত

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ‘ব্যাংকক পোস্ট’ ও ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭৮ মিটার দীর্ঘ এই জাহাজটি রাসায়নিক ও শিল্পজাত কাঁচামাল নিয়ে ভারতের দিকে আসছিল। বুধবার ওমান উপকূল থেকে মাত্র ১১ নটিক্যাল মাইল দূরে থাকাকালীন অজ্ঞাত স্থান থেকে দুটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র (Projectile) জাহাজটিকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়।

  • প্রথম আঘাত: সরাসরি জাহাজের ইঞ্জিনে লাগে, ফলে মুহূর্তের মধ্যে ইঞ্জিন রুমে বিধ্বংসী আগুন ধরে যায়।
  • দ্বিতীয় আঘাত: জাহাজের উপরের ডেকে আছড়ে পড়ে, যার ফলে মূল কাঠামোতে বড়সড় ফাটল দেখা দেয়।

আকাশচুম্বী কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ। প্রাণ বাঁচাতে নাবিকরা আন্তর্জাতিক বিপদ সংকেত বা এসওএস (SOS) বার্তা পাঠান।


উদ্ধার অভিযান: ওমান নৌবাহিনীর তৎপরতা

ঘটনার গুরুত্ব বুঝে দ্রুত সক্রিয় হয় রয়্যাল নেভি অফ ওমান। ওমান নৌবাহিনীর কমান্ডোরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে জ্বলন্ত জাহাজ থেকে ২০ জন নাবিককে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। তবে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এখনও ৩ জন নাবিক জাহাজের ভেতর আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। থাইল্যান্ড সরকার ও রয়্যাল থাই নেভি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে।


ভারতের অর্থনীতিতে অশনি সংকেত: ৫টি প্রধান সংকট

এই হামলা কেবল একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর আক্রমণ নয়, বরং ভারতের অর্থনীতির ওপর বড়সড় আঘাত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী:

১. জ্বালানি নিরাপত্তা: ভারতের আমদানিকৃত খনিজ তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই হরমোজ প্রণালী দিয়েই আসে। এই পথ রুদ্ধ হলে দেশে পেট্রোল-ডিজেলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। ২. শিল্পে কাঁচামালের অভাব: জাহাজটি সরাসরি গুজরাটের রাসায়নিক শিল্পের কাঁচামাল নিয়ে আসছিল। এমন হামলা নিয়মিত হলে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। ৩. পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি: ঝুঁকি বাড়লে বিমা সংস্থাগুলো প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দেয়, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হবে সাধারণ ক্রেতাকে চড়া দামের মাধ্যমে। ৪. সাপ্লাই চেইন বিপর্যয়: ভারতগামী জাহাজে হামলা মানেই আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের বাণিজ্যিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও পণ্য সরবরাহে ধস নামা। ৫. নৌ-নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ: আরব সাগরের উত্তর অংশে এখন ভারতীয় নৌবাহিনীকে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ও ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করতে হবে, যা সামরিক বাজেটে চাপ সৃষ্টি করবে।


হরমোজ প্রণালীর গুরুত্ব ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি বিশ্বের ‘বাণিজ্যিক ধমনী’। ইরান ও ইজরায়েলের চলমান সংঘাতের আবহে এই অঞ্চলে নৌ-চলাচল এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও এই হামলার দায় এখনও কেউ স্বীকার করেনি, তবে আমেরিকা ও ব্রিটেন একে ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর কাপুরুষোচিত হামলা’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

ভারতীয় নৌবাহিনী এবং উপকূলরক্ষী বাহিনী ইতিমধ্যেই আরব সাগরে নজরদারি একধাক্কায় বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতগামী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিতে নৌবাহিনীর শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.