Supreme Court: ‘নাবালক-নাবালিকার মধ্যেও পারস্পরিক সম্মতিতে হওয়া যৌন সম্পর্ককে কখনই ধর্ষণ বলা যাবে না!’ নতুন আইন ‘রোমিও-জুলিয়েট…’

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) কেন্দ্রীয় সরকারকে যৌন অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষা (POCSO) আইনে একটি ‘রোমিও-জুলিয়েট’ (Romeo-Juliet Act) ধারা প্রবর্তন করার আহ্বান জানিয়েছে। এই ধারার মূল লক্ষ্য হলো—কিশোর-কিশোরীর প্রকৃত প্রেমের সম্পর্ককে ফৌজদারি বিচার থেকে অব্যাহতি দেওয়া। আদালত লক্ষ্য করেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে পরিবার বা অন্য পক্ষগুলো ব্যক্তিগত ‘হিসাব মেটাতে’ বা প্রতিহিংসা নিতে এই আইনটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

‘রোমিও-জুলিয়েট’ ধারা কী?

এটি একটি আইনি ছাড় বা অব্যাহতি, যা সমবয়সী বা কাছাকাছি বয়সের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে হওয়া যৌন সম্পর্ককে ‘সংবিধিবদ্ধ ধর্ষণ’ (Statutory Rape) হিসেবে গণ্য হওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়।

গত ৯ জানুয়ারি এক রায়ের দীর্ঘ উত্তরলিপিতে (Post-script) বিচারপতি সঞ্জয় করোল পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, “মেয়ের পরিবার যখন কোনো কিশোরের সাথে প্রেমের সম্পর্ক মেনে নিতে পারে না, তখন তারা পকসো মামলা দায়ের করে। এটি এখন একটি অতি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে এবং এর ফলে ওই তরুণ ছেলেদের দিনের পর দিন জেলে পচতে হচ্ছে।”

পকসো আইনের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ

আদালত এই রায়ের অনুলিপি কেন্দ্রীয় আইন সচিবের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে যাতে এই ‘সামাজিক ব্যাধি’ দমনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়। আদালত উদ্বেগের সাথে জানিয়েছে যে, পকসো আইনের অপব্যবহারের বিষয়টি তারা বারবার লক্ষ্য করছে।

বিচারপতি করোল লিখেছেন, “যখন মহৎ উদ্দেশ্যে তৈরি একটি আইনকে প্রতিশোধ নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে অপপ্রয়োগ করা হয়, তখন ন্যায়বিচারের মূল ধারণাটিই উল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়। আদালত ইতিপূর্বেও অনেক মামলায় এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে সতর্ক করেছে।”

আদালত সমাজে বিদ্যমান একটি ‘করুণ বৈষম্য’ বা ফাটলের দিকেও আলোকপাত করেছে। একদিকে এমন অনেক শিশু ভিকটিম রয়েছে যারা ভয়, দারিদ্র্য বা সামাজিক লোকলজ্জার কারণে নীরব থাকতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, এমন কিছু মানুষ আছে যারা শিক্ষিত, সামাজিক ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং তারা নিজেদের স্বার্থে আইনকে সহজেই ‘ম্যানিপুলেট’ বা প্রভাবিত করতে পারছে।

আদালতের মতে, “কেবল যে ভিকটিমের বয়স বাড়িয়ে কঠোর ধারায় মামলা করার ঘটনা ঘটছে তাই নয়, বরং তরুণদের মধ্যকার সম্পর্কের বিরোধিতা করতে পরিবারগুলোও এই আইন ব্যবহার করছে।”

বয়সের অসংগতি ও আদালতের নির্দেশ

উত্তরপ্রদেশ সরকার বনাম এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি মামলার আপিল শুনানি চলাকালীন এই পর্যবেক্ষণগুলো সামনে আসে।

উক্ত মামলায় স্কুল রেকর্ড অনুযায়ী ভিকটিমের বয়সে ব্যাপক অসংগতি ছিল এবং অভিযুক্তকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়া হয়েছিল। ভিকটিম নিজেও তার বয়সের বয়ান এবং অভিযুক্তের সাথে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

হাইকোর্ট ভিকটিমের ‘অসিফিকেশন টেস্ট’ (হাড়ের পরীক্ষার মাধ্যমে বয়স নির্ধারণ) সহ ডাক্তারি পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট জামিন আদেশে হস্তক্ষেপ না করলেও ডাক্তারি পরীক্ষার বিষয়টিকে সমর্থন জানায়। শীর্ষ আদালত ২০১৫ সালের জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টের ৯৪ ধারার কথা উল্লেখ করে জানায় যে, বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথমে স্কুল সার্টিফিকেট বা মিউনিসিপ্যাল সার্টিফিকেটকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যদি কোনো নথি না থাকে, তবেই শেষ উপায় হিসেবে ডাক্তারি পরীক্ষার আশ্রয় নেওয়া যাবে।

রায়ে বলা হয়েছে, কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্কের মামলার ক্ষেত্রে আদালতকে চারটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে: ১. সম্পর্কের প্রকৃতি ও গভীরতা। ২. উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য। ৩. ভিকটিমের জবানবন্দি গুরুত্ব সহকারে বিশ্লেষণ করা। ৪. সম্পর্কটি পারস্পরিক স্নেহ ও সম্মতির ভিত্তিতে কি না, তা খতিয়ে দেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.