‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’ – এর মিলন বিন্দু ‘শিব’

‘সত্য’ই সুন্দর। আর ‘শিব’ই পরম সত্য।আদি শঙ্করাচার্য ‘নির্বাণ ষটকম’-এর শ্লোকে সেই সত্যেরই পরিচয় করিয়েছেন। সেই পরম সত্যে পৌঁছনোর প্রথম ধাপ হিসেবে ‘ভক্তি’কেই আশ্রয় করতে হয়।
‘শিবরাত্রি’ উপলক্ষে ‘শিব’ সারা ভারতবর্ষব্যাপি পূজিত হন।সনাতন ধর্মের শাস্ত্রসমূহে ‘শিব’ পরমসত্ত্বারূপে ঘোষিত।সংস্কৃত ‘শিব’ শব্দের অর্থ শুভ, দয়ালু ও মহৎ। ‘শিব’ সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের কারণ।
সনাতন ধর্মের আদিযুগ থেকেই ‘শিব’ পূজিত হয়ে আসছেন।সুবিশাল বৈদিক সাহিত্যের বিভিন্ন অংশে ‘শিব’ এর মাহাত্ম্য বিভিন্ন নামে প্রকাশিত হয়েছে।ঋগবেদে শিব ‘রুদ্র’ নামে পরিচিত। তিনি জন্মরহিত,শাশ্বত,সর্বকারণের কারণ , সমস্ত জ্যোতির জ্যোতি।
শ্বেতাশ্বেতর উপনিষদে বলা হয়েছে ,
‘যদাহতমস্তন্ন দিবা ন রাত্রির্নসন্ন চাসচ্ছিব এব কেবলঃ’
অর্থাৎ যখন আলো ছিল না অন্ধকারও ছিল না, দিন ছিল না রাত্রিও ছিল না, সৎ ছিল না অসৎও ছিলনা তখন কেবল মাত্র ঈশ্বর শিবই ছিলেন।
ভগবান শিব সৃষ্টির প্রাক্কালে শ্রীবিষ্ণু কে বলেন–
“অহং ভবানয়ঞ্চৈব রুদ্রোহয়ং যো ভবিষ্যতি।
একং রূপং ন ভেদোহস্তি ভেদে বন্ধনং ভবেৎ।।
তথাপীহ মদীয়ং শিবরূপং সনাতনম্।
মূলভূতং সদা প্রোক্তং সত্যং জ্ঞানমনন্তকম্।।”(জ্ঞানসংহিতা)
অর্থাৎ আমি ,তুমি ,এই ব্রহ্মা এবং রুদ্র নামে যিনি উৎপন্ন হবেন এই সকলেই এক এদের মধ্যে কোন ভেদ নাই ,ভেদ থাকলে বন্ধন হত ।তথাপি আমার শিব রূপ সনাতন এবং সকলের মূল স্বরূপ বলে কথিত হয় যা সত্য জ্ঞান ও অনন্ত স্বরূপ।

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ব্যাকরণ পাণিনি রচিত সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ।১৪ টি শিবসূত্র বা মাহেশ্বর সূত্র পাণিনির ‘অষ্ট্যাধ্যায়ী’র মূল সূত্র।এই সূত্রগুলি হলো–
১. অ ই উ ণ্ ,২. ঋ ৯ ক্ ,৩. এ ও ঙ্ ,৪. ঐ ঔ চ্, ৫. হ য ৱ র ট্, ৬. ল ণ্ ,৭. ঞ ম ঙ ণ ন ম্ , ৮. ঝ ভ ঞ , ৯. ঘ ঢ ধ ষ্ ,১০. জ ব গ ড দ শ্ ,১১. খ ফ ছ ঠ থ চ ট ত ৱ্ ,১২. ক প য্ ,১৩. শ ষ স র্ ,১৪. হ ল্
কথিত আছে ‘অণ্’ থেকে ‘হল্’ পর্যন্ত এই সূত্রগুলি শিবের ডমরু থেকে উৎপন্ন হয়েছে ১৪ টি বিভিন্ন রকম শব্দের ফলে। অর্থাৎ শিবের ডমরু থেকে উৎপন্ন চতুর্দশ শিবসূত্র থেকেই ব্যাকরণ বিদ্যার উৎপত্তি।

‘শিব’ নাট্যশাস্ত্রের আদি প্রবক্তা।শিব , নাট্যশাস্ত্রের জ্ঞান প্রজাপতি ব্রক্ষ্মা কে দিয়েছিলেন।ব্রক্ষ্মা থেকে ভরত মুনি এই জ্ঞান লাভ করেন যা ভরতমুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ নামে পরিচিত ।
শিবকে যোগের দেবতাও মনে করা হয়।তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুরে ‘সদগুরু’ নামে খ্যাত জাগ্গী বাসুদেবের নকশায় তৈরি ‘আদিযোগী’ মূর্তি বর্তমানে সারা পৃথিবীর পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র ।এছাড়াও তিনি চিকিৎসাবিদ্যা ও কৃষিবিদ্যার আবিষ্কারক।শিবকে সাধারণত ‘শিবলিঙ্গ’ নামক বিমূর্ত প্রতীক রূপে পূজা করা হয়।
সারা ভারতবর্ষে শিব বিভিন্ন নামে পূজিত হন।এদের মধ্যে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ বিখ্যাত। জ্যোতির্লিঙ্গগুলির প্রতিটির আকার ও ইতিহাসের দিক থেকে স্বকীয়তা বিদ্যমান।
দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ গুলি হল সোমনাথ (গুজরাট),নাগেশ্বর(গুজরাট), মল্লিকার্জুন(অন্ধ্রপ্রদেশ), মহাকালেশ্বর(মধ্যপ্রদেশ),ওংকারেশ্বর(মধ্যপ্রদেশ), কেদারনাথ(উত্তরাখণ্ড) , ভীমশঙ্কর(মহারাষ্ট্র), বিশ্বনাথ (উত্তরপ্রদেশ), ত্র্যম্বকেশ্বর(মহারাষ্ট্র), ঘৃষ্ণেশ্বর(মহারাষ্ট্র) , বৈদ্যনাথ(ঝাড়খন্ড) , ও রামেশ্বরম(তামিলনাড়ু)।
অর্থাৎ ‘শিব ভক্তি’ ভারতবর্ষকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে এবং উত্তর থেকে দক্ষিনে একসূত্রে বেঁধেছে।ভাষা-মত-পরিধান ও আচারের বিভিন্নতা সত্ত্বেও সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভক্তি অখন্ড ভারতবর্ষে ঐক্যের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছে যা হাজার বৈদেশিক আক্রমণ সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত প্রবহমান। ভারতবর্ষের অখন্ডতা তাঁর সাংস্কৃতিক ঐক্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত যা তাঁর সনাতন ধর্মের গর্ভজাত।
ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক জ্যোতির্লিঙ্গ সোমনাথ ও কাশী বিশ্বনাথে বৈদেশিক শত্রুদের আক্রমণ সত্ত্বেও ‘শিবভক্তি’ মহাকালের নিয়মেই পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।
নতুন নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে আজ আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিবলিঙ্গের খোঁজ পাচ্ছি যা সারা বিশ্বে সনাতন ধর্মের ব্যপ্তিকে প্রমাণ করে।ভিয়েতনামে চতুর্থ শতাব্দীর, ইন্দোনেশিয়াতে পঞ্চদশ শতাব্দীর ,রোমের ভ্যাটিকান সিটিতে সপ্তম শতাব্দীর ,আফ্রিকাতে ৪০০০ বছর আগেকার এবং ভারতের হরপ্পায় ৫০০০ বছরের পুরনো শিবলিঙ্গ ‘মহাকাল’এর অনন্ত, শাশ্বত রূপের পরিচয় দেয়।
স্বামী বিবেকানন্দ ভারতে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন –“শিশিরবিন্দু যেমন নিঃশব্দে অদৃশ্য ও অশ্রুতভাবে পড়িয়া অতি সুন্দর গোলাপকলিকে প্রস্ফুটিত করে, সমগ্র পৃথিবীর চিন্তারাশিতে ভারতের দান সেইরূপ বুঝিতে হইবে। নীরবে, অজ্ঞাতসারে অথচ অদম্য মহাশক্তিবলে উহা সমগ্র পৃথিবীর চিন্তারাশিতে যুগান্তর আনিয়াছে, তথাপি কেহই জানে না—কখনও এরূপ হইল।” শিবভক্তি যেন নিঃশব্দেই সারা পৃথিবীকে এক সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল যার ইতিহাস এখন বিস্মৃত।
ইউরোপীয় পরমাণু গবেষণা সংস্থা ‘সার্ন’ এর কেন্দ্রে সৃষ্টি-স্থিতি-লয় এর কারণ, তান্ডবনৃত্যরত ‘নটরাজ’ এর মূর্তি বসানো হয়েছে যা সৃষ্টিতত্ত্বের খোঁজে সনাতন ধর্মের দর্শনকেই স্বীকৃতি দেয়।
অর্থাৎ শিল্প , সাহিত্য , বিজ্ঞান সহ এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে ‘শিব’ প্রাসঙ্গিক নয়। যুক্তি-ভক্তি-আস্থা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি ‘শিব’ময়।
ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক ঐক্য শিবভক্তির মাধ্যমে সুদৃঢ় হোক–মহাকালের কাছে এই হোক প্রতিটি ভারতবাসীর প্রার্থনা।

পিন্টু সান্যাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.