গীতাপাঠ ঘিরে রবিবার ব্রিগেডে জমায়েতের যে চেহারা দেখা গেল, তাতে রাজ্যের হিন্দুত্ববাদী শিবির উচ্ছ্বসিত। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে একই কর্মসূচি ঘিরে ব্রিগেডে জমায়েত যেমন ছিল, এ বারের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। সমাগম নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে গেল কিছু ক্ষণের জন্য। অঘটন এড়াতে বাগেশ্বর ধামের পীঠাধীশ্বর আচমকাই ভাষণ শেষ করে দিতে বাধ্য হলেন। তবে সংক্ষিপ্ত ভাষণে একাধিক বক্তাই প্রতীকী উপায়ে রাজনৈতিক বার্তা দিলেন গীতাপাঠের মঞ্চ থেকে। কখনও তা ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ নিয়ে, কখনও ভোট এগিয়ে আসতে থাকা পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে।
সকাল ৯টা থেকে কর্মসূচি শুরু হলেও মূল অনুষ্ঠান অর্থাৎ গীতাপাঠ শুরু হয় ১২টা নাগাদ। গীতাপাঠের আগে ছিল বেদপাঠ এবং কীর্তনের অনুষ্ঠান। প্রথম, নবম এবং অষ্টাদশ, গীতার এই তিনটি অধ্যায় পাঠ করা হয়। পাঠ শেষের পরে ছিল ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক নেতাদের ভাষণ। যাঁদের মাঝে ভাষণ দেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসও।

গীতাপাঠ শেষ হওয়ার পরে প্রথমে ভাষণ দেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রথম সারির মুখ তথা দুর্গা বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা সাধ্বী ঋতম্ভরা। তাঁর নাম মঞ্চ থেকে ঘোষিত হতেই জমায়েতে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যায়। মাঠের শেষ প্রান্ত থেকে হুড়োহুড়ি করে দর্শকাসনের মাঝের পথ ধরে মঞ্চের সামনের দিকে ছুটতে শুরু করেন হাজার খানেক লোক। পরিস্থিতি দেখে ঋতম্ভরা ভাষণ দীর্ঘায়িত করেননি। তবে সেই নাতিদীর্ঘ ভাষণেও আলগোছে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা তিনি করেন। ঋতম্ভরা বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের মাটি জেগে ওঠো, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু জেগে ওঠো। দুষ্টের দমন করো।’’ হিন্দুরাষ্ট্রের নামে জয়ধ্বনি দিয়েই বক্তৃতা শুরু করেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের মাটি থেকে তিনি ‘অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা’ ঘোষণা করছেন বলেও রবিবার ঋতম্ভরা মন্তব্য করেন। তবে এই ‘অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা’ ঘোষণার অর্থ কী, সে ব্যাখ্যা আয়োজকদের তরফ থেকে কেউ দিতে চাননি।

রাজ্যপাল নিজের ভাষণে মহাভারতের এবং গীতার নানা অংশ উদ্ধৃত করেন। এবং প্রতিটি অংশের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতিকে তার সঙ্গে জুড়ে দেন। ‘পরিত্রাণায় সাধুনাং’ শ্লোক উদ্ধৃত করে তিনি রাজ্যে ‘দুষ্টের দমনের’ ডাক দেন। মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের অর্জুনকে কর্মে মনোযাগী হওয়ার পরামর্শ মনে করিয়ে রাজ্যপাল বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ কর্ম করার জন্য প্রস্তুত।’’ তার পরে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ ধর্মীয় ঔদ্ধত্যকে শেষ করার জন্য প্রস্তুত।’’
জমায়েতের উচ্ছ্বাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বাগেশ্বর বাবা নামে পরিচিত ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী ভাষণ শুরু করতেই। কিন্তু কট্টরবাদী ভাষণের জন্য পরিচিত ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ রবিবারের ব্রিগেডে স্বমূর্তিতে পৌঁছোনোর সুযোগ পাননি। তাঁর ভাষণের সময়ে এত লোক জোর করে মঞ্চের কাছে এগিয়ে আসার চেষ্টা শুরু করেন যে অঘটন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের ভাষণের মাঝেই আয়োজকেরা মাইকে বার বার সকলকে পিছিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করতে থাকেন। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ নিজেও একাধিক বার ভাষণ থামিয়ে সকলকে পিছিয়ে যেতে বলেন। তাতে কাজ না হওয়ায় ভারত সেবাশ্রমের সন্ন্যাসী তথা সমবেত গীতাপাঠের অন্যতম প্রধান আয়োজক স্বামী প্রদীপ্তানন্দ (কার্তিক মহারাজ) মঞ্চের সামনে হাজির হয়ে সকলকে হাতজোড় করে অনুরোধ করেন পিছিয়ে যাওয়ার। তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না-আসায় বাগেশ্বর ধামের প্রধান মহন্ত ভাষণ শেষ করে দেন। ভিড় চাপ বাড়তে থাকার কারণেই তিনি ভাষণ শেষ করছেন বলে ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ জানান। তবে বলেন, ‘‘কলকাতায় এসে আমার খুব ভাল লেগেছে। আমি আবার কলকাতায় আসব।’’ সংক্ষিপ্ত ভাষণেও হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার ডাক দিতে বাগেশ্বর বাবা ভোলেননি। বলেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা যদি একত্রিত হন, তা হলে ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হবে।’’

এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। ছিলেন দিলীপ ঘোষ, তথাগত রায়, রাহুল সিংহের মতো প্রাক্তন রাজ্য সভাপতিরাও। ছিলেন বিজেপির বিভিন্ন সারির আরও অনেক নেতা।
রবিবার একসঙ্গেই ব্রিগেডে ঢুকতে দেখা যায় সুকান্ত এবং দিলীপকে। বেশ কিছু ক্ষণ পরে পৌঁছোন শুভেন্দু। তবে সামনের সারিতে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট আসনে না-বসে মাঠের পিছনের দিকে মাটিতে বসেছেন শুভেন্দু। বিজেপি সূত্রে খবর, প্রথমে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট আসনেই বসেছিলেন শুভেন্দু। কিন্তু তিনি উপস্থিত হতেই ছবি তোলার হুড়োহুড়ি শুরু হয়। তার পরেই পিছন দিকে গিয়ে মাটিতে বসে পড়েন তিনি।
গীতাপাঠের জন্য তিনটি মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। মূল মঞ্চের দু’পাশে অপেক্ষাকৃত ছোট দু’টি মঞ্চ ছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছিলেন সাধুসন্তরা। রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিরাও ছিলেন মঞ্চে। কর্মসূচিতে যোগ দেন মতুয়াদের একাংশ।

