দেবী সরস্বতীর বর লাভ করার জন্যই গৃহে, বিদ্যালয়ে, সারস্বত প্রতিষ্ঠানে, ক্লাবে-সংগঠনে পূজা করা হয়। বিদ্যায় বোধন, প্রকৃত জ্ঞানার্জন, বিদ্যাকর্মে প্রতিষ্ঠা, নৃত্য-গীত-সঙ্গীত-কলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সফল হবার প্রার্থনায় দেবী আরাধনা হয়। অর্থাৎ একটি উদ্দেশ্য এখানে ক্রিয়াশীল। দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতী পূজা — এগুলি তাই এক একটি কাম্য-পূজা; নিষ্কাম দেবী আরাধনা নয়। তাই সংকল্প করেই তা করতে হবে, এমনটাই শাস্ত্রীয় বিধান। ততে কামনা সফল হয়।
শাস্ত্র বিচার করে সংকল্প করলে এবং সেই অনুযায়ী কৃত্য করলে শাস্ত্র-সম্মত হবে। পূজার মন্ত্র আদিতে প্রদত্ত হয়েছিল সংস্কৃত ভাষায়। ঋষিমুনিরা মন্ত্রগুলি প্রথম দর্শন করে তা বিধৃত করেছেন এই ভাষায়। পূজার পদ্ধতি লোকার্পণ হয়েছে সংস্কৃত ভাষায়। পূজাগুলি তাই বৈদিক আচারের অংশ। তাই বাংলায় নয়, সংস্কৃত ভাষাতেই দেবীমন্ত্র পাঠ করতে হবে, তবেই তা শাস্ত্র-সম্মত হবে।
তাই বলে কী মা-কে সবসময়ের জন্য মাতৃভাষায় ডাকতে পারবো না? নিশ্চয়ই পারবো, তাই তো এতদিন ডেকে এসেছি — মাগো, অবিদ্যার বিপ্রতীপে বিদ্যা দাও, ওগো বিদ্যার দেবী। মাতৃভাষায় নিষ্কাম ডাকে তিনি সাড়া দেবেনই। তারজন্য আপনার ভাব-ভাষা আপনার নিজেরই হোক, অন্যের লিখে দেওয়া, সুপারিশ করা, মুখস্থ করা কৃত্রিম ড্রাফ্টে নয়। এতে ড্রাফ্ট-ওয়ালাদের মর্যাদা বাড়ে বটে, আপনার ভাব নিয়ে দেবীর কাছে পৌঁছানো হয় না৷ মায়ের কাছে ভক্তের সকল ভাষাই বোধগম্য। অতএব কামনা-বাসনা বাইরে রেখে, মহামিলনের আকাঙ্ক্ষায়, মায়ের ধ্যানজপ করার সময় যেকোনো ভাষাতেই মায়ের সংজ্ঞা-স্বরূপ-বৈশিষ্ট্য আমরা ভাবতে পারি, প্রত্যক্ষ করতে পারি। পাশাপাশি সংস্কৃত মন্ত্রের বাঙ্গলা অর্থ ঈশ্বর বিশ্বাসী প্রকৃত পণ্ডিতদের কাছ থেকেই জেনে নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু মন্ত্রপাঠ কোনোমতেই আঁতলামোর আবহে বাংলায় হতে পারে না।
সংস্কৃত ভাষা বাংলা ভাষার জননী। সেই জননী তো মৃত নয়! এখনও সংস্কৃতের চর্চা, পঠন-পাঠন-গবেষণা এবং পাঠাভ্যাস বজায় রয়েছে। পারিবারিক অনুষ্ঠান যেমন বিবাহ, উপনয়ন সংস্কার ইত্যাদির আমন্ত্রণ পত্রে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য/সদস্যার নামেই প্রচার ও আমন্ত্রণ জানানো হয়। ঠাকুরদাদা/ঠাকুরমা বেঁচে থাকতে পারিবারিক অনুষ্ঠানে বাবা/মায়ের নামে আমন্ত্রণ পত্র ছাপানো হয় কী? সেই রকম, বাংলা ভাষার মাতামহী সংস্কৃত ভাষা জীবিত থাকতে, সেই ভাষাতেই পূজার মন্ত্র পাঠ হওয়া উচিত। কোনো রকম এক্সপেরিমেন্ট এখানে চলবে না। আর মাতামহী-ভাষা এতটা দুর্বোধ্যও নয়, চেষ্টা করলেই বোঝা যায়, কারণ ধ্রুপদী বাঙ্গলার বহু শব্দ তৎসম এবং তদ্ভব, বহু-ভাব সংস্কৃত-কেন্দ্রিক।
কলকাতার অধিকাংশ বারোয়ারী পূজাগুলি থিমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেখানে অধিকাংশ সময় প্রকৃত শাস্ত্রীয় আচার পালিত হয় না। শাস্ত্র-বিধান ব্যাতিরেকে দেবী পূজা অসম্পূর্ণ। শাস্ত্রকে মর্যাদা দিয়েই দুর্গাপূজা সহ নানান পূজার কৃত্য সাধন করতে হয়। নইলে তো ‘যা ইচ্ছে তাই’ করাই যায়!
দুর্গাপূজা শাস্ত্র মেনেই করা উচিত, জানিয়েছেন রিষড়ার প্রেম মন্দির আশ্রমের সম্পাদক পরমপূজ্য শ্রীমৎ নির্গুণানন্দজী মহারাজ। অশ্বমেধ যজ্ঞ, গোমেধ যজ্ঞ ইত্যাদি কলিযুগে করণীয় নয়। কিন্তু অশ্বমেধ যজ্ঞের সম-ফল লাভ হয় দুর্গাপূজা করলে। ঐ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ব্রহ্মলীন শ্রীশ্রী তারানন্দ ব্রহ্মচারী মহারাজের মতে প্রতিটি হিন্দুর অন্তরে দেবী তাঁর শক্তির উৎস প্রবাহিত করে দেন, আর তাতেই তারা শক্তিমান হন। আজ সারা বিশ্বে ধ্বংসের লীলা চলছে। সৃষ্টি ও ধ্বংসের লীলা প্রাকৃতিক নিয়মেই চলে, সনাতন ধর্মপ্রবণ ভারতবর্ষের তত্ত্বজ্ঞানীজন কিন্তু এই ধ্বংসের মূর্তি দেখে শিহরিত হন না৷ তত্ত্বদর্শীরা জগতের সৃষ্টি ও বিনাশে বিচলিত হন না। গতিশীল এবং পরিবর্তনশীল এই জগত; বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড এক বৃহৎ শক্তির লীলা; সেই শক্তির অঙ্কেই জগতের যাবতীয় পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু মন্ত্রশক্তি চিরায়ত; এক এবং অভিন্ন। আপনি অভিন্ন ধারায় মায়ের আরাধনায় ব্রতী হোন।


