২০০৭ থেকে ২০২৫। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেড় যুগ পার করে ফেলেছেন রোহিত শর্মা। তিন ধরনের ক্রিকেট মিলিয়ে তাঁর ঝুলিতে প্রায় ২০ হাজার রান। রয়েছে ৪৯টি শতরান। সেই ৩৭ বছরের রোহিতকে আইপিএলে খেলার ধরন বদলানোর পরামর্শ দিচ্ছেন প্রাক্তন ক্রিকেটারদের একাংশ! তাঁদের মতে, বদলাতে পারলে অভিজ্ঞ ব্যাটারের সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
আগ্রাসী খেলাই পছন্দ রোহিতের
ব্যাটার রোহিত ধরে খেলতে পছন্দ করেন না। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের জন্যই তিনি পরিচিত। পাওয়ার প্লের সুবিধা কাজে লাগিয়ে দ্রুত রান তুলতে ভালবাসেন। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের জন্য রোহিতকে ক্রিকেটপ্রেমীদের একাংশ ‘হিটম্যান’ বলেন। খেলোয়াড়দের বিশেষ কোনও দক্ষতায় মুগ্ধ ভক্তেরা তাঁদের আদরের নাম দেন। এমনি এমনি রোহিত থেকে ‘রো-হিট’ এবং তা থেকে ‘হিটম্যান’ হননি।
বীরেন্দ্র সহবাগ ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের যে ধারা প্রবর্তন করেছিলেন, রোহিত সেটাকেই সযত্নে লালন করেছেন। একাধিক লক্ষ্য নিয়ে দলের ইনিংস শুরু করতে নামেন রোহিত। বিশেষত সাদা বলের ক্রিকেটে। প্রথমত, প্রতিপক্ষ দল এবং বোলারদের চাপে রাখতে চান। দ্বিতীয়ত, অধিনায়ক বা দলের সিনিয়র ব্যাটার হিসাবে নিজের কাঁধে বাড়তি দায়িত্ব তুলে নেন, অতিরিক্ত ঝুঁকি নেন। রোহিত ২২ গজে থাকলে চিন্তায় থাকেন প্রতিপক্ষ দলের অধিনায়কেরা।
ফর্মে নেই রোহিত
কিছু দিন ধরে চেনা ফর্মে নেই রোহিত। ঘরের মাঠে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ়ে একটি অর্ধশতরান করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়া সফরে টানা তিনটি টেস্টে রান না পেয়ে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন সিরিজ়ের পঞ্চম টেস্ট থেকে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজ়ে একটি শতরান করলেও বাকি দু’ম্যাচে ব্যর্থ। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও ফাইনাল ছাড়া বড় রান পাননি। আইপিএলের প্রথম ম্যাচেও ব্যর্থ হয়েছেন ব্যাট হাতে। শোনা যাচ্ছে, দু’মাস পর ইংল্যান্ড সফর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেন রোহিত। অস্ট্রেলিয়া সফরের সময়ই রোহিতের ক্রিকেট ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। শোনা যায়, টেস্ট ক্রিকেটের দলে তাঁকে নাকি আর চাইছেন না কোচ গৌতম গম্ভীর। যদিও অস্ট্রেলিয়াতেই অবসরের জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর জানিয়েছেন, এক দিনের ক্রিকেট থেকে অবসরের ভাবনা নেই তাঁর। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পরই ২০ ওভারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা করেছিলেন রোহিত। তবে অন্য দু’ধরনের ক্রিকেটে সেই রাস্তায় হাঁটার ইচ্ছা নেই তাঁর।

রোহিতকে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
আইপিএলে তাঁর পারফরম্যান্সের সঙ্গে টেস্ট বা এক দিনের ক্রিকেটের দলে জায়গা পাওয়ার সম্পর্ক আপাত ভাবে নেই। তবু ধারাবাহিক ব্যর্থতার প্রভাব পড়তে পারে। সেই যুক্তিতে রোহিতকে ব্যাট করার ধরন পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন অনেকে। আইপিএলের প্রথম ম্যাচে রোহিত চার বল খেলে শূন্য রানে আউট হওয়ার পর কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত বলেছেন, ‘‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও রোহিত প্রথম বল থেকেই বড় শট নেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমার মতে, আইপিএলে প্রথম কয়েকটা বল রোহিতের দেখে খেলা উচিত। ব্যাটের মাঝের অংশে ঠিক মতো বল লাগতে শুরু করার পর বড় শট খেলুক। ক্রিজ়ে গিয়ে নিজেকে একটু সময় দিলে ব্যাটের মাঝখান দিয়ে খেলতে পারবে। তাতে আউট হওয়ার সম্ভাবনা কমবে। রোহিতের টাইমিংয়ের সমস্যা হচ্ছে। এ রকম ক্ষেত্রে ব্যাট-বলে ঠিক মতো সংযোগ হওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’’ ভারতের প্রাক্তন অধিনায়কের যুক্তি সমর্থন করেছেন শেন ওয়াটসন। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অলরাউন্ডার বলেছেন, ‘‘২২ গজে গিয়ে রোহিতের অন্তত প্রথম ছ’টা বল দেখে খেলা উচিত। ইনিংসের একদম শুরুতে বোঝা যায় না পিচ কেমন আচরণ করবে। কয়েকটা বল খেলে পিচের চরিত্র সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে নেওয়া উচিত। বল কতটা উচ্চতায় উঠছে, কেমন সুইং হচ্ছে এগুলো বুঝে নেওয়া জরুরি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে অধিকাংশ সময় রোহিতের ব্যাটের কানায় লাগছে বল। ফলে ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না রোহিত।’’
ওয়াটসনের পর্যবেক্ষণ, বাঁহাতি জোরে বোলারদের বিরুদ্ধে সমস্যায় পড়ছেন রোহিত। তাঁদের বলের সুইং বুঝতে পারছেন না। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার বলেছেন, ‘‘বাঁহাতি জোরে বোলারদের বিরুদ্ধে রোহিতের সমস্যা নতুন নয়। ফর্মে থাকলে অনায়াসে একের পর এক বড় শট খেলে। সে সময় এই খামতি চোখে পড়ে না। বল পুরো সুইং করা পর্যন্ত অপেক্ষা করে না। তার আগেই আগ্রাসী শট খেলে। বোলারদের ঘাড়ে চড়ে বসতে চায়। কিন্ত কখনও কখনও একটু ধরে খেলা দরকার। ইনিংসের শুরুতে সতর্ক থাকলে রোহিত লাভবান হতে পারে।’’
শ্রীকান্তও আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন। ওয়াটসন শুধু জোরে বোলার হিসাবেও হেলাফেলা করার মতো ছিলেন না। নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে রোহিতের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন দুই প্রাক্তন। তাঁদের বক্তব্য রোহিত শুনেছেন কি না জানা নেই। শুনলে তাঁদের পরামর্শমতো নিজের খেলার ধরন বদলাবেন, তাও নিশ্চিত নয়। রোহিত যথেষ্ট অভিজ্ঞ। আগ্রাসী ব্যাটিং করেই দলকে অনেক ম্যাচ জিতিয়েছেন। বহু বার একার হাতে জিতিয়েছেন। হয়তো আগামী দিনেও জেতাবেন। শ্রীকান্ত, ওয়াটসনেরা চান রোহিত সেই সুযোগ পান।
গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ক্রিকেটার রোহিত
রোহিতের ক্রিকেটজীবন দাঁড়িয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। ক্রিকেটার রোহিত আরও কতটা এগোতে পারবেন, তা খানিকটা হলেও নির্ভর করবে আইপিএলে তাঁর পারফরম্যান্সের উপর। ব্যাটার রোহিতকে নিয়ে তৈরি হওয়া অনাস্থা, ভরসাহীনতার আবহ বদলে দিতে পারে শুধু তাঁর ব্যাট। বিষয়টা অজানা নয় রোহিতের। নিজের ইনিংসকে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়ে অধিনায়ক হিসাবে প্রশংসা কুড়োতে পারেন। তবে বার বার ব্যর্থ হলে ব্যাটার রোহিতকে নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কারণ অধিকাংশ সময় দলকে চাপে ফেলে দিচ্ছেন তিনি।
১৮ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আঁচে নিজেকে সেঁকে ফেলা রোহিতের জন্য নেতিবাচক আবহ অস্বস্তির। ক্রিকেটার হিসাবে তাঁর ভাবমূর্তির সঙ্গে বেমানান। একটা একটা করে রানের গাঁথনিতে গড়ে তোলা ক্রিকেটীয় সৌধের গায়ে কালি লাগতে পারে। তাঁর লিটার লিটার রক্ত জল করে ফেলা পরিশ্রমকে বিদ্রুপ করতে পারে। সত্যিই কি তাই? না। কয়েকটা ইনিংসের ব্যর্থতা রোহিতের এত দিনের সাফল্য মুছে দিতে পারে না। দেশকে দু’টি আইসিসি ট্রফি জেতানো অধিনায়কের কৃতিত্ব সামান্যতমও কমাতে পারবে না। ভারতীয় ক্রিকেটে রোহিতের অবদান বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই।
বিশ্বের তাবড় খেলোয়াড়েরা অফ ফর্মের শিকার হয়েছেন। খেলোয়াড়দের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় খেলার সময় থেকেই সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রশংসা-সমালোচনা, স্তুতি-কটূক্তি, উচ্ছ্বাস-হতাশা খেলোয়াড়দের মজ্জায় মজ্জায় মিশে যায়। কোনও খেলোয়াড় ব্যর্থ হতে পছন্দ করেন না। হারার জন্য মাঠে নামেন না। শেষ পর্যন্ত নিজেকে নিংড়ে দিতে চান। রোহিতও ব্যতিক্রম নন।

অধরা সমাধান
প্রথম সারির খেলোয়াড়েরাও অনেক সময় নিজেদের ভুল ধরতে পারেন না। সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন না। অন্য কারও সাহায্য প্রয়োজন হয়। সাহায্যকারী সতীর্থ হতে পারেন। কোচ হতে পারেন। প্রাক্তন কোনও খেলোয়াড় হতে পারেন। আবার যে কেউ হতে পারেন। যেমন অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে বিরাট কোহলি গিয়েছিলেন সঞ্জয় বাঙ্গারের কাছে। যেমন এক বার সচিন তেন্ডুলকরের ভুল ধরিয়ে দিয়েছিলেন রেস্তরাঁর এক কর্মী। রোহিতও হয়তো নিজের সমস্যা ধরতে পারছেন না। নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ় থেকেই পারছেন না। ভারতীয় দল বা মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের কোচেরাও যদি ধরতে না পারেন, তাঁকে ফর্মে ফেরাতে না পারেন, তা দুর্ভাগ্যের। রোহিত নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা না করলেও দুর্ভাগ্যের। দলের পরিকল্পনার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা আর ফর্মে ফিরতে না পারা এক নয়। সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব যেমন সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের, তেমনই কোচদেরও।
একজন খেলোয়াড় কবে অবসর নেবেন, তা ঠিক করার অধিকার শুধু তাঁর। একজন খেলোয়াড় দলে নির্বাচিত হবেন কি না, তা নিয়ে মতামত দিতে পারেন কোচ-নির্বাচকেরা। কথা বলতে পারেন সমালোচকেরাও। সেই আলোচনায় অবসরের প্রসঙ্গ না থাকাই কাম্য, সমীচীন। খেলার ধরন বদলালেই রোহিত সফল হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার না বদলালে ফর্মে ফিরতে পারবেন না, তা-ও বলা যায় না। মাঠে নেমে রান রোহিতকেই করতে হবে। পিচ, আবহাওয়া যেমনই হোক। বলের রং লাল বা সাদা হোক। সামনে জোরে বোলার বা স্পিনার থাকুক। রোহিত বহু বার বলেছেন, বাইরের কথায় কান দেন না। সমাজমাধ্যমের আলোচনা, সমালোচনার খোঁজ রাখেন না। হয়তো বিশেষজ্ঞ ধারাভাষ্যকারদের মন্তব্যেও গুরুত্ব দেন না। তবু নিজের খেলার ধরন বদলে দেখতে পারেন রোহিত। বলটা তাঁর প্রিয় এক ফালি উইলোর মাঝামাঝি লাগতে শুরু করলেই উবে যাবে অনিশ্চয়তার আবহ।
ক্রিকেটার রোহিতের হারানোর কিছু নেই। প্রাপ্তির ভান্ডারও প্রায় পূর্ণ। প্রায় শব্দটাকে মুছতে হলে অধরা এক দিনের বিশ্বকাপটা জিততে হবে। তার জন্য ২০২৭ পর্যন্ত ক্রিজ়ে টিকে থাকতে হবে। নিজেকে এক বার বদলে দেখতে পারেন। স্বপ্ন ছোঁয়ার জন্য মানুষ কত কিছু করে। রোহিতও কি কম করেছেন? আইপিএল ক্রিজ়ে নেমে নিজেকে একটু সময় দিতে পারবেন না!