ব্রিগেডে ‘হিসাব’ বুঝে নেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি মোদীর: ‘জঙ্গলরাজ’ হঠিয়ে ‘অত্যাচারী’দের জেলযাত্রার ‘গ্যারান্টি’ প্রধানমন্ত্রীর

ব্রিগেডে ‘হিসাব’ বুঝে নেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি মোদীর: ‘জঙ্গলরাজ’ হঠিয়ে ‘অত্যাচারী’দের জেলযাত্রার ‘গ্যারান্টি’ প্রধানমন্ত্রীর

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজিয়ে শনিবার ব্রিগেডের জনসমুদ্র থেকে তৃণমূল সরকারকে নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গত ছয়টি জনসভায় ‘পরিবর্তন’-এর ডাক দিলেও, এদিনের ভাষণে মোদীর সুর ছিল বহুগুণ চড়া। ক্ষমতা দখলের আহ্বানের সঙ্গেই তিনি বারবার মনে করিয়ে দিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে গত কয়েক বছরের ‘অত্যাচার’-এর প্রতিটি পাই-পয়সার হিসাব নেওয়া হবে। অন্তত তিনবার প্রধানমন্ত্রীর মুখে শোনা গেল এই ‘হিসাব’ বুঝে নেওয়ার হুঁশিয়ারি, যা রাজ্যের রাজনৈতিক পারদকে এক ধাক্কায় শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।


সফল ব্রিগেড: সাংগঠনিক শক্তির প্রদর্শন

শনিবারের ব্রিগেড সমাবেশকে রাজ্য বিজেপির সাম্প্রতিক ইতিহাসের ‘সফলতম’ জমায়েত বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বাসে করে দক্ষিণবঙ্গ এবং ১৬টি বিশেষ ট্রেনে উত্তরবঙ্গ থেকে আসা মানুষের ভিড়ে ময়দান ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। মোদী নিজেও ভিড় দেখে দরাজ প্রশংসা করে বলেন, “যত দূর চোখ যাচ্ছে, শুধু মানুষ আর মানুষ। তৃণমূল সেতু আটকে, গাড়ি আটকে এই জনস্রোত দমাতে চেয়েছিল, কিন্তু নির্মম সরকার দেখে নাও— তোমরা কাউকে দমিয়ে রাখতে পারোনি।”


তিন বার হুঁশিয়ারি: “খুঁজে খুঁজে হিসাব নেওয়া হবে”

৪৫ মিনিটের ভাষণে মোদী তিনবার কড়া হুঁশিয়ারি দেন: ১. প্রথম হুঁশিয়ারি (৭ মিনিটের মাথায়): মোদী বলেন, “সেই দিন দূরে নয়, যখন পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন হবে। কোনও অত্যাচারীকে ছাড়া হবে না। খুঁজে খুঁজে হিসাব নেওয়া হবে।” ২. দ্বিতীয় হুঁশিয়ারি (৩০ মিনিটের মাথায়): কর্মসংস্থান ও নারী সুরক্ষা নিয়ে আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেন, “যারা আপনাদের ভয় দেখায়, তাদের ভয়ের দিন শুরু হতে চলেছে। অপরাধীদের জায়গা হবে জেল। এটা মোদীর গ্যারান্টি।” ৩. তৃতীয় হুঁশিয়ারি (৩৭ মিনিটের মাথায়): “তৃণমূল সরকারের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। এখানে বিজেপির সরকার গঠিত হওয়ার পর এক দিকে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ নীতি চলবে, অন্য দিকে প্রত্যেকের হিসাব নেওয়া হবে।”


‘নির্মম সরকার’ ও দুর্নীতির তোপ

ভাষণে একবারও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না নিয়ে তাঁকে ‘নির্মম সরকার’ (মমতা শব্দের বিপরীত শব্দ) বলে আক্রমণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন:

  • কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বাধা: আয়ুষ্মান ভারত, পিএম বিশ্বকর্মা ও জল জীবন মিশনের মতো প্রকল্প বাংলায় চালু করতে না দিয়ে গরিব মানুষকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
  • কাটমানি ও দুর্নীতি: মোদীর দাবি, যতক্ষণ না ‘কাটমানি’ মিলবে, ততক্ষণ তৃণমূল কোনও প্রকল্পের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছোতে দেবে না।
  • আবাস যোজনায় গরমিল: কেন্দ্রীয় প্রকল্পের নাম বদলে ফেলা এবং প্রাপক তালিকায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরব হন তিনি।

বাঙালিয়ানা ও আবেগের ছোঁয়া

তৃণমূলের ‘বাঙালি-বিরোধী’ তকমার জবাব দিতে মোদী এদিন বেশ কিছু বাক্য বাংলায় বলেন। যুবকদের কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে বলেন, “এই স্বপ্ন আপনার। আর এই স্বপ্ন পূরণ করা মোদীর গ্যারান্টি।” আবার নারী সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগের সুরে বলেন, “বাবা-মায়ের মেয়েদের এখন বলেন— বাড়ি ফিরে এসো সন্ধে নামার আগে।” প্রধানমন্ত্রীর কথায়, এই নির্বাচন কেবল সরকার বদল নয়, বরং “বাংলার আত্মাকে বাঁচানোর নির্বাচন”।


অনুপ্রবেশ ও তোষণ নিয়ে আক্রমণ

অনুপ্রবেশকারী এবং তোষণের রাজনীতির ধারক-বাহকদের জেল হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন মোদী। পাশাপাশি মহুয়া মৈত্র এবং মমতার সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত মন্তব্য তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন, কোন সম্প্রদায় কোটি কোটি লোককে শেষ করে দেওয়ার কথা বলছে? বালাকোট এয়ারস্ট্রাইকের প্রমাণ চাওয়া বা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে ‘অসম্মান’ করার বিষয়গুলি তুলে ধরে তৃণমূলকে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নেও কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন তিনি।

শনিবারের এই সমাবেশ বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’র আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও, মোদীর ভাষণ আসলে নতুন লড়াইয়ের সূচনা করে দিল। যে ‘হিসাব’ নেওয়ার গ্যারান্টি তিনি দিলেন, তা ভোটবাক্সে কতটা প্রতিফলিত হয়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.