মোবাইলের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে হবে, বদলাতে হবে সফ্‌টঅয়্যারও! সাইবার সুরক্ষায় স্মার্টফোন নির্মাতাদের প্রস্তাব কেন্দ্রের

এ বার মোবাইলের সোর্স কোড জানাতে হবে সরকারের কাছে। সফ্‌টঅয়্যারেও বেশ কিছু পরিবর্তন করতে হবে। সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে, বিভিন্ন স্মার্টফোন সংস্থাকে সম্প্রতি এমনটাই প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তা নিয়ে অ্যাপ্‌ল, স্যামসাং-এর মতো প্রথম সারির মোবাইল সংস্থাগুলির অন্দরে অসন্তোষও দেখা দিয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে কেউই কোনও মন্তব্য করেনি।

কোনও মোবাইল কী ভাবে কাজ করবে, তা স্থির করে সোর্স কোড। এটি এমন কিছু নির্দেশ বা কমান্ড, যা কোনও অ্যাপ্লিকেশন তৈরির জন্য লেখা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অনলাইন প্রতারণা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় দেশব্যাপী সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ করছে কেন্দ্র। সূত্রের দাবি, নতুন এই শর্তগুলিও সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যই করা হচ্ছে। রয়টার্স জানাচ্ছে, মোবাইলের সোর্স কোডগুলি ভারতের নির্দিষ্ট গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করা হবে। সম্ভবত সেগুলি পরীক্ষাও করা হবে।

পাশাপাশি আরও বেশ কিছু শর্তের কথা বলা হয়েছে। মোবাইল সংস্থাগুলিকে নিজেদের সফ্‌টঅয়্যারে বিশেষ কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। যাতে মোবাইলে আগে থেকে ইনস্টল থাকা অ্যাপগুলিকেও আনইনস্টল করা যায়। অ্যাপগুলি অব্যবহৃত অবস্থায় (ব্যাকগ্রাউন্ডে) থাকাকালীন যাতে ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোন ব্যবহার করতে না পারে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মোবাইলের লগ (কী কী কাজ হচ্ছে, তার ডিজিটাল রেকর্ড) সেই স্মার্টফোনে অন্তত ১২ মাসের জন্য সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে।

বস্তুত, গত মাসেই ‘সঞ্চার সাথী’ অ্যাপ নিয়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা ঘিরে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। নতুন মোবাইলগুলিতে আগে থেকে সরকারি অ্যাপ ‘সঞ্চার সাথী’ ইনস্টল করা থাকতে হবে বলে মোবাইল সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্র। সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিরোধিতা শুরু হয় রাজনৈতিক মহলে। বিতর্কের মুখে পিছু হটে কেন্দ্র। এ বার মোবাইল সংস্থাগুলির জন্য কেন্দ্রের নতুন এক গুচ্ছ শর্তের কথা উঠে আসছে।

স্মার্টফোনের জন্য ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। ভারতীয় বাজারে প্রায় ৭৫ কোটি স্মার্টফোন রয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইনে জালিয়াতি এবং ডেটা চুরির ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা চিন্তায় ফেলেছে কেন্দ্রীয় সরকারকে। এ অবস্থায় কেন্দ্রের নতুন শর্ত যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি সচিব এস কৃষ্ণণ রয়টার্সকে বলেন, “স্মার্টফোন সংস্থাগুলির কোনও যুক্তিযুক্ত উদ্বেগ থাকলে, তা নিয়ে অবশ্যই খোলাখুলি আলোচনা করে সমাধান করা হবে। এখনই এ বিষয়ে কিছু ভেবে নেওয়াটা ঠিক হবে না।”

মন্ত্রকের এক মুখপাত্র জানান, এই প্রস্তাবগুলি নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে মোবাইল সংস্থাগুলির আলোচনা এখনও চলছে। তাই তাঁরা এখনই এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে পারছেন না। কেন্দ্রের এই নতুন শর্তের বিষয়ে অ্যাপ্‌ল, স্যামসাং, গুগ্‌ল, শাওমির মতো সংস্থাগুলির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে রয়টার্স। ভারতে মোবাইল সংস্থাগুলির সংগঠন ‘ম্যানুফ্যাকচারার্‌স অ্যাসোসিয়েশন ফর ইনফরমেশন টেকনোলজি’-এর সঙ্গেও যোগযোগের চেষ্টা করে তারা। তবে কোনও তরফেই কোনও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

বস্তুত, স্মার্টফোন সংস্থাগুলি নিজেদের সোর্স কোড-এর বিষয়ে বরাবরই সংবেদনশীল। এই সোর্স কোড তারা সবসময়েই সুরক্ষিত রাখতে চায়। অতীতে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে অ্যাপ্‌ল-এর থেকে সোর্স কোর্ড চেয়েছিল চিন। কিন্তু অ্যাপ্‌ল তাতে পাত্তা দেয়নি। এমনকি মার্কিন তদন্তকারী সংস্থাও অ্যাপ্‌ল-এর সোর্স কোড পাওয়ার চেষ্টা করেছিল অতীতে। তারাও ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন মোবাইল সংস্থার সূত্র রয়টার্সকে জানাচ্ছে, গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার কারণে সোর্স কোড দেওয়া সম্ভব নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলিতেও এমন কোনও বাধ্যতামূলক শর্ত নেই— তা-ও উল্লেখ করেছে তারা।

সূত্রের খবর, ভারতে মোবাইল সংস্থাগুলির সংগঠন গত সপ্তাহেই এই শর্তগুলি বাদ দেওয়ার জন্য মন্ত্রককে অনুরোধ করেছে। তারা মনে করছে ১২ মাসের জন্য মোবাইলের লগ সংরক্ষণ করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ডিভাইসগুলিতে থাকে না। সফ্‌টঅয়্যার আপডেটের জন্যও সরকারের অনুমোদন চাওয়া বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.