চারবার চিঠি পাঠিয়েও উত্তর না মেলায় এবার পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক অনীহার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিল ভারতের নির্বাচন কমিশন। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনগুলির জন্য নবান্নের কাছ থেকে পর্যবেক্ষকদের তালিকা চাওয়া হলেও রাজ্য কোনো সাড়া দেয়নি বলে অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে কমিশন নিজেই ১৫ জন আইএএস (IAS) এবং ১০ জন আইপিএস (IPS) আধিকারিককে সরাসরি কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে তলব করেছে।
সংবিধান বনাম প্রশাসনিক অনীহা
নির্বাচন কমিশনের রেকর্ড অনুযায়ী, গত বছরের ২৪ নভেম্বর থেকে একাধিকবার রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের ডেপুটি কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতী সংবিধানের ৩২৪ (১), ৩২৪ (৬) এবং ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২০ (খ) ধারার উল্লেখ করে ২৯ নভেম্বরের মধ্যে তালিকা চেয়েছিলেন। এরপর ২, ৯ এবং ১৬ ডিসেম্বর ধারাবাহিক রিমাইন্ডার পাঠানো হলেও নবান্ন থেকে কোনো সদুত্তর মেলেনি।
জগদীশ প্রসাদ মীনা সহ ২৫ আধিকারিককে তলব
রাজ্য নাম না পাঠানোয় কমিশন এবার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের উপস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেই বৈঠকে যে ১৫ জন আইএএস-কে তলব করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান স্বরাষ্ট্রসচিব জগদীশ প্রসাদ মীনা। কমিশনের আন্ডার সেক্রেটারি এমএল মীনা রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে চিঠিতে এই নির্দেশের কথা জানিয়েছেন।
বিশিষ্ট মহলের উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া
কেন্দ্র-রাজ্য এই সংঘাত নিয়ে সরব হয়েছেন সমাজকর্মী ও প্রাক্তন প্রশাসনিক আধিকারিকরা:
- অশোকমোহন চক্রবর্তী (প্রাক্তন মুখ্যসচিব): তিনি জানান, কমিশনের চিঠি দিলে তার জবাব দেওয়া আবশ্যিক। রাজ্য কোনো নামের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা পরিমার্জনের অনুরোধ করতে পারে, কিন্তু নীরব থাকা কাম্য নয়।
- ডঃ পঙ্কজ রায় (অধ্যক্ষ): সংবিধানের ৩২৪ থেকে ৩২৯ ধারার উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবিধানিক শপথ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করা গণতন্ত্রের পক্ষে লজ্জাজনক।
- ডঃ মীরাতুন নাহার (শিক্ষাবিদ): তিনি এই সংঘাতকে ‘নকল যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।
- রবীন দেব (সিপিএম নেতা): রাজ্যের এই বেপরোয়া মনোভাবের কড়া সমালোচনা করে তিনি এর নেপথ্যে বিজেপি ও তৃণমূলের গোপন বোঝাপড়ার অভিযোগ তুলেছেন।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নতুন জটিলতা
সংঘাত কেবল পর্যবেক্ষক নিয়োগেই সীমাবদ্ধ নেই। কমিশনের অনুমতি ছাড়াই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (SIR) কাজে নিযুক্ত তিন আধিকারিককে বদলি ও অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল রাজ্য সরকার। বর্তমান মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে চিঠি দিয়ে কমিশন সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, সরকারের এই নির্দেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
সব মিলিয়ে, বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচন কমিশনের কড়া পদক্ষেপ ও রাজ্যের পাল্টা অবস্থানে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

