প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ইঁদুরদৌড় ও লক্ষ্যপূরণের প্রবল চাপ কীভাবে একজন মেধাবী তরুণকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে, তার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত তৈরি হলো উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে। এমবিবিএস (MBBS) কোর্সে প্রতিবন্ধী কোটায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেতে নিজের বাঁ পায়ের চারটি আঙুল করাত দিয়ে কেটে ফেললেন ২৪ বছর বয়সী সুরজ ভাস্কর।
ঘটনার বিবরণ ও পুলিশের প্রাথমিক বিভ্রান্তি
জৌনপুরের লাইন বাজার এলাকার বাসিন্দা সুরজ পেশায় একজন ফার্মাসি ডিপ্লোমাধারী। গত ১৮ জানুয়ারি রাতে তিনি পুলিশকে জানান যে, দুই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাঁর ঘরে ঢুকে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে এবং অচৈতন্য অবস্থায় তাঁর পায়ের আঙুল কেটে পালিয়ে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ খুনের চেষ্টার মামলা রুজু করলেও তদন্তে নেমে একাধিক অসঙ্গতি খুঁজে পায়।
তদন্তে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্য:
- সুরজের ঘর থেকে একটি করাত, অ্যানাস্থেশিয়ার খালি শিশি এবং ব্যবহৃত সিরিঞ্জ উদ্ধার করা হয়।
- ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা যায়, ঘটনার রাতে ওই ঘরে বাইরের কোনো ব্যক্তির প্রবেশ ঘটেনি।
- জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সুরজের প্রেমিকা স্বীকার করেন যে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে যেকোনো উপায়ে ডাক্তারিতে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন সুরজ।
নেপথ্যে ‘প্রতিবন্ধী কোটা’ পাওয়ার লক্ষ্য
পুলিশি জেরায় জানা গেছে, সুরজ টানা তিনবার ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি জানতেন, সাধারণ ক্যাটাগরিতে সুযোগ পাওয়া কঠিন, তাই নিজেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রমাণ করে সংরক্ষিত আসনে জায়গা করে নিতেই তিনি এই ভয়ানক পথ বেছে নেন। ফার্মাসি নিয়ে পড়ার সুবাদে অ্যানাস্থেশিয়া ও অস্ত্রোপচার সংক্রান্ত প্রাথমিক জ্ঞান তাঁর ছিল, যা তিনি নিজের শরীরেই প্রয়োগ করেন।
বিশেষজ্ঞ মহলের উদ্বেগ
এই ঘটনাটি ভারতের বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি সামনে এনেছে।
“আজকের দিনে চাকরির নিরাপত্তা নেই। ফলে অনেকে মরিয়া হয়ে সামাজিক বা শারীরিক ভাবে নিজেকে পিছিয়ে রেখে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। এটি প্রায় আত্মহত্যারই শামিল।” — প্রশান্ত রায়, সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়।
অন্যদিকে, মনোসমাজকর্মী মোহিত রণদীপ বিষয়টিকে একটি ‘মানসিক সমস্যা’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট একটি পেশা না পেলে জীবন ব্যর্থ— এই একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘অবসেসিভ প্যাটার্ন’ থেকে তরুণ সমাজকে বের করে আনা জরুরি। ডাক্তার না হতে পারা মানেই জীবনের শেষ নয়, এই বোধ থেরাপির মাধ্যমে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পূর্ববর্তী নজির
বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনার সাথে দেড় বছর আগের আমলা পূজা খেড়করের ঘটনার তুলনা টানছেন। পূজা ভুয়া প্রতিবন্ধী ও ওবিসি (OBC) শংসাপত্র ব্যবহার করে ইউপিএসসি (UPSC) পাশ করেছিলেন। সুরজের ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সমাজে এই ধরনের অসাধু ও আত্মঘাতী প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
জৌনপুরের পুলিশ সুপার (সিটি) গোল্ডি গুপ্ত জানিয়েছেন, পড়াশোনার চাপ ও লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থতা থেকেই সুরজ তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। বর্তমানে তাঁর শারীরিক চিকিৎসা চললেও, তাঁর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন এখন অনিশ্চিত আইনি জটিলতার মুখে।

